সম্পাদকীয়
দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-বাণিজ্যের বড় একটি অংশ পরিচালিত হয়। ফলে এ বন্দরের কাস্টমস কার্যক্রম শুধু রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে নয়, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ এবং বাজারব্যবস্থার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। রাজস্ব ফাঁকি ও মিথ্যা ঘোষণা ঠেকাতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থান তাই নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। তবে এই কঠোরতার কারণে বৈধ আমদানিকারকদের পণ্য খালাসে অযথা বিলম্ব হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা জরুরি।
বৃহস্পতিবার সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সন্দেহজনক পণ্যচালানের শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করছে কাস্টমসের আইআরএম টিম। বিভিন্ন অভিযানে মিথ্যা ঘোষণা ও ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য শনাক্ত হয়েছে, কয়েকটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে এবং প্রায় ৩০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ও শনাক্ত হয়েছে। এসব পদক্ষেপ প্রমাণ করে, কার্যকর নজরদারি থাকলে রাজস্ব ফাঁকির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে কম শুল্ক পরিশোধ, ঘোষণার আড়ালে অতিরিক্ত পণ্য আনা কিংবা বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রাষ্ট্রের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাই এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
তবে সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন সন্দেহজনক চালান শনাক্তের পাশাপাশি বৈধ চালানও দীর্ঘ পরীক্ষার মধ্যে পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কোনো চালান পরীক্ষা ও খালাসে তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত সময় লাগছে। একটি চালান বন্দরে পড়ে থাকার অর্থ ব্যবসায়ীর শুধু সময় নষ্ট নয়; এর সঙ্গে বাড়ে পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয়, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে বিলম্ব এবং কখনো উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে পণ্যের দামেও।
আধুনিক কাস্টমস ব্যবস্থায় তাই ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব আমদানিকারক, পণ্য, চালান বা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্য কিংবা অতীত অনিয়মের রেকর্ড রয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরীক্ষা করা উচিত। বিপরীতে নিয়মিতভাবে আইন মেনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানের চালান দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা করতে হবে। ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ, আমদানিকারকের পূর্ববর্তী রেকর্ড, ঘোষিত মূল্য, পণ্যের ধরন ও এইচএস কোড বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ চালান সহজেই আলাদা করা সম্ভব।
বেনাপোল কাস্টমসের রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির বিষয়টিও আলোচনার দাবি রাখে। একই সময়ে আমদানির পরিমাণও কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই রাজস্ব বাড়বে না। আমদানি কমার কারণ, ব্যবসায়ীদের প্রতিবন্ধকতা এবং কাস্টমস প্রক্রিয়ায় কোথায় সময় ও ব্যয় বাড়ছে- এসব বিষয়ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
কাস্টম হাউজের কমিশনারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ রাজস্ব ফাঁকি বন্ধের দায়িত্ব যেমন ব্যবসায়ীদের, তেমনি কাস্টমস ব্যবস্থার ভেতরের অনিয়ম ও যোগসাজশ বন্ধ করাও সমান জরুরি।
বেনাপোল দেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যদ্বার। তাই এখানে প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সন্দেহজনক চালানে কঠোরতা, বৈধ চালানে দ্রুততা এবং অনিয়মে সর্বোচ্চ জবাবদিহি থাকবে। রাজস্ব ফাঁকি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে; কিন্তু বৈধ ব্যবসার গতিও থামিয়ে দেওয়া যাবে না। রাজস্ব সুরক্ষা ও বাণিজ্যিক গতিশীলতার মধ্যে এই ভারসাম্যই হওয়া উচিত বেনাপোল কাস্টমসের প্রধান লক্ষ্য।