যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

নতুন বোয়িং কেনা নিয়ে নানামত

সুবর্ণভূমি ডেস্ক

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১০:৪৮ পিএম
নতুন বোয়িং কেনা নিয়ে নানামত

বাংলাদেশ বিলিয়ন ডলার খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে আরও উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে- সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে এই তথ্য জানান যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া-বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর। এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আরেকটি ‘দারুণ চুক্তি’ করেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এরপর থেকে বাংলাদেশে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

কারণ চলতি বছরেরই ৩০ এপ্রিল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল, যার আওতায় তখন বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার কথা জানানো হয়েছিল।

কিন্তু এরপরেও সার্জিও গর-এর পোস্ট থেকে অনেকে এই ইঙ্গিতই পাচ্ছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

যদিও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ মন্ত্রীরা প্রতিনিয়ত বলে আসছেন যে, দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলেও দাবি করছেন তারা।

একই সময়ে ইরান যুদ্ধের কারণে তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। অর্থের অভাবে বড় প্রকল্প নেওয়া থেকে বিরত থাকার কথাও বলেছে সরকার।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন করে ঋণের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলকে গত জুনেই চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকেও নানাভাবে সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা চলছে।

এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে বোয়িং থেকে বিমান কেনার আদেশ দেওয়া কতটা প্রয়োজনীয় ছিল সেই প্রশ্নও উঠছে।

প্রশ্ন উঠছে যে, এত উড়োজাহাজ কি যাত্রী চাহিদার কারণে কেনা হচ্ছে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হুমকি মোকাবিলায় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে কেনা হচ্ছে। কিংবা এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক কারণ বা চাপ আছে কি-না।

তবে মঙ্গলবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছেন, কোনো চাপে নয়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ বাংলাদেশের চাহিদা অনুযায়ীই কেনা হচ্ছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশকে সরকার এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, যে কারণে ৭০ থেকে ৮০টা বড় উড়োজাহাজের চাহিদা রয়েছে বাংলাদেশের এভিয়েশনে খাতে।

প্রয়োজন কতটা, লাভ হবে কতটা

সরকারের দিক থেকে মার্কিন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে যখন দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের নানা পরিকল্পনার কথা বলছে সরকার।

গত এপ্রিলে সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকার ১৬ বছর সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল।

এর মধ্যে জুনের প্রথম সপ্তাহে আইএমএফের বাংলাদেশবিষয়ক মিশনপ্রধান ইভো কার্জনার এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচিকে সমর্থন দিতে নতুন ঋণ চেয়ে তাদের চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কী পরিমাণ ঋণ চাওয়া হয়েছে সে ব্যাপারে বিবৃতিতে কিছু বলা হয়নি।

এমনকি প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান না থাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য পে স্কেল ঘোষণা করেও তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে পারছে না সরকার। সে কারণে ধাপে ধাপে সেটি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক রুটে সম্মিলিত যে বাজার, তাতে বাংলাদেশি বিমান সংস্থাগুলোর হিস্যা প্রায় ২৫ শতাংশ। বাকি প্রায় ৭৫ শতাংশই বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর দখলে।

এ পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা ২০২৭ সালের মধ্যে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ তাদের বহরে যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিল গত ১৯ জুলাই। যাত্রী বিবেচনায় কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরবসহ বেশ কিছু রুটে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে তারা।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে এখন উড়োজাহাজ আছে ১৯টি। আর দশটি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেছেন বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স গত ৩০ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।

বিমান বাংলাদেশের এক বিজ্ঞপ্তিতে তখন জানানো হয়েছে, যে ১৪টি উড়োযান কেনা হবে তার মধ্যে ১০টি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার মডেলের। আর চারটি ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের উড়োজাহাজ।

ওই সময় জানানো হয়েছিল, ১৪টি উড়োজাহাজের বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

এর মধ্যে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস বাংলাদেশকে আরও দশটি উড়োজাহাজ সরবরাহের প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। তাদের প্রস্তাবে ছয়টি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং চারটি এ৩২১ নিও ন্যারোবডি উড়োজাহাজ বিক্রির কথা বলা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এভিয়েশন বা বিমান পরিবহন দ্রুত বর্ধনশীল খাত। বাংলাদেশ এখন বছরে এক কোটির মতো যাত্রী পরিবহন করছে, যা আগামী এক দশকের মধ্যেই আড়াই কোটিতে উন্নীত হবে বলে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো ধারণা দিচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, যাত্রী বিবেচনায় কতটি উড়োজাহাজ দরকার এবং আগামী ১৫ বছরে নতুন যত উড়োজাহাজ আসবে সেগুলো কোথায় কীভাবে ব্যবহার করে লাভবান হওয়া যাবে?

এছাড়া, বিমানের এত উড়োজাহাজ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা আছে কি-না তা যথাযথ বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা হয়েছে কি-না।

বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে লিখিত প্রশ্ন করেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলছেন, সরকার এখন যেসব উড়োজাহাজের ক্রয় আদেশ দেবে বা দিচ্ছে সেগুলো ধাপে ধাপে হয়তো আগামী ১৫ বছরে বাংলাদেশ বিমানের বহরে যুক্ত হবে।

‘আগে অর্ডার দিলে দাম কম হয়। আগামী দশ বছরে যাত্রী হবে এখন থেকে দুই বা আড়াই গুণ বেশি। ফলে বিমানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এখন দেশের এভিয়েশন খাত বিদেশি এয়ারলাইন্সের হাতে জিম্মি। তারাই বাজারের ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে,’ বলছিলেন তিনি।

কিংবা যত যাত্রীর আশা করা হচ্ছে এবং সম্ভাব্য বাস্তব পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়েও এত উড়োজাহাজ সত্যিই প্রয়োজন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বড় বিমান বহর পরিচালনার সক্ষমতা বিমানের আছে কি-না সেটি বড় প্রশ্ন। বিমান গত ৫৪ বছরে নিজেদের লাভজনক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি। এটা সরকারি কর্পোরেশন হিসেবে তৈরি হয়েছে। বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্স হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সক্ষম বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান না হলে শেষ পর্যন্ত উড়োজাহাজগুলো তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।’

সবমিলিয়ে স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান বা কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে এবং যাত্রী সংখ্যার ব্যাপক বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে পারলে নতুন উড়োজাহাজ কেনাটা বাংলাদেশের জন্য লাভজনকই হবে বলে তিনি মনে করেন।

আরেকজন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ, এটিএম নজরুল ইসলাম বলছেন, বিমান যদি কমার্শিয়াল ও মার্কেটিং কৌশল বিশ্লেষণ করে উড়োজাহাজগুলো কেনার কারণ জানাতে পারতো তাহলে যৌক্তিকতা বোঝা যেত।

কিন্তু সম্ভবত এখানে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বিষয় কিংবা বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টিও কাজ করছে বলে মনে করেন তিনি।

তার মতে, ‘বাজারের কথা চিন্তা করলে বিমানের ক্যাপাসিটি বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। কিন্তু তাদের কৌশল কী? তারা কি চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়েছে, নাকি কেনাটাই তাদের কৌশল- এগুলো পরিষ্কার করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য ২৫টি উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে কি-না সেই আলোচনা তো আছে।’

‘তবে এটিও সত্যি যে, যথাযথ পরিকল্পনা নিতে পারলে এই পরিকল্পনা থেকে বাংলাদেশ লাভবানও হতে পারবে। সেজন্য শুধু উড়োজাহাজ কেনা নয়, বরং পর্যাপ্ত প্রকৌশলী ও পাইলট তৈরি, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে,’ বলেছেন তিনি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির অবশ্য মঙ্গলবার এ সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশের যেসব দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী।

‘তাই তাদের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও বাড়ানো হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও উড়োজাহাজ কেনাকাটা করা হবে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে ৭০ থেকে ৮০টি বা তারও বেশি উড়োজাহাজের চাহিদা রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নীতিগতভাবে বোয়িং বিমান কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে,’ বলেছেন তিনি।

তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে এয়ারক্রাফট বহর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, না হলে নতুন রুট চালু করা সম্ভব হবে না ও ব্যবসা হারাতে হবে।

সূত্র: বিবিসি

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)