সুবর্ণভূমি ডেস্ক
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল কাঙ্ক্ষিত নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে সরকার, যা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। সোমবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এর অনুমোদন দেওয়া হয়।
নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৪২ ও সর্বনিম্ন ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পাবে, যা বাস্তবায়িত হবে তিন ধাপে। এ ক্ষেত্রে গ্রেড-১ এর জন্য এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০তম গ্রেডের জন্য বেতন ২০ হাজার টাকা।
মূল্যস্ফীতি ও বাজেটের ওপর চাপ কমাতে দুই অর্থবছরে তিন ধাপে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও পে-স্কেল
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা পুরোপুরি ভালো না থাকা এবং বিভিন্ন সংকটের মধ্যেও সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি। তিনি জানিয়েছেন, সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘ ১২ বছর কোনো বেতন বাড়েনি, ফলে তাদের জীবনযাত্রার মান অনেক কমে গেছে। এটি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এবং উভয় দিকের ভারসাম্য রক্ষা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সোমবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল কাঙ্ক্ষিত নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদিত হয়। আগামী ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকর হবে। এরপর সোমবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, যুদ্ধাবস্থা, গ্যাস সংকট ও দেশের ভালো না থাকা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও কেন বেতন বাড়ানো হলো? এর উত্তরেই মন্ত্রিপরিষদ সচিব এ কথা বলেন।
নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে সর্বোচ্চ ১৪২ ও সর্বনিম্ন ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পাবে। এই বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়ন করা হবে তিন ধাপে। নতুন স্কেল অনুযায়ী গ্রেড-১ এর জন্য এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের জন্য ২০ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে।
কার বেতন কত
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল কাঙ্ক্ষিত নবম পে-স্কেলের অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। তিন ধাপে কার্যকর হবে এই পে-স্কেল। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, গ্রেড-১ এ সর্বোচ্চ মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা। আর ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা।
সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়।
নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৪২ ও সবনিম্ন ১০০ শতাংশ বেতন বাড়বে, যা বাস্তবায়িত হবে তিন ধাপে। এ ক্ষেত্রে গ্রেড-১ এর জন্য এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০তম গ্রেডের জন্য বেতন ২০ হাজার টাকা। এ ছাড়াও নবম পে-স্কেল অনুযায়ী প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু হতে যাচ্ছে। যার আওতায় মাসে তিন হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে।
নবম বেতন কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
কমিশনের হিসাবে, প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও নয় লাখ পেনশনভোগীর পেছনে বর্তমানে বছরে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এ বরাদ্দ ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তখন তিনি বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতন কাঠামোয় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মূল বেতন বাড়বে তিন ধাপে
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ সরকারি চাকরির ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন হবে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা। সরকারের হিসাবে, নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন আগের তুলনায় ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে।
তবে পুরো বেতন বৃদ্ধি একবারে কার্যকর হবে না। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দশম থেকে ২০তম গ্রেডের স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সরকারের এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অন্যতম কারণ একসঙ্গে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা।
নতুন বেতন কাঠামোয় পুরনো পেনশনারদের জন্যও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন (ওআরওপি) এখনই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি এবং এর জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় ২০৩০ সালের মধ্যে এটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এর আগে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পেনশন বাড়ানোর নতুন ফর্মুলা অনুমোদন করা হয়েছে। এতে কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা বেশি হারে সুবিধা পাবেন।
নয় হাজার টাকা বা এর কম নিট পেনশন হলে বাড়বে ১০০ শতাংশ। নয় হাজার এক থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার এক থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৬৫ শতাংশ। ৩০ হাজার এক থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৬০ শতাংশ। ৪০ হাজার এক টাকা বা তার বেশি হলে বাড়বে ৫৫ শতাংশ। ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসর নেওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা এ সিদ্ধান্তে বেশি সুবিধা পাবেন।
প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসে তিন হাজার টাকা
নতুন বেতনস্কেলে প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসিক ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য একজন সরকারি কর্মচারী মাসে তিন হাজার টাকা ভাতা পাবেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অতিরিক্ত পরিচর্যা ও পরিবারের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সবার জন্য মোবাইল ভাতা
নতুন বেতন কাঠামোর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের একটি হলো মোবাইল ভাতার আওতা বাড়ানো। নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী প্রথম থেকে ২০তম- সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী এ ভাতা পাবেন। এত দিন পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন। সরকারি দপ্তরগুলোতে ই-মেইল, অনলাইন সভা, ডিজিটাল ফাইল ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক কাজ বাড়ায় প্রায় সব পর্যায়ের কর্মচারীকেই ব্যক্তিগত মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ভাতার আওতা বাড়ানো হয়েছে।
নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া নয় লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ নতুন ব্যবস্থার সুবিধা পাবেন। এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।