সম্পাদকীয়
যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার প্রকল্পটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। কিন্তু ছয় বছর ধরে চলা প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি মাত্র ১২ শতাংশ বলে শুক্রবার সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ তথ্য কেবল হতাশাজনক নয়, বরং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার বর্ধিত সময়সীমা যখন প্রায় শেষের পথে, তখন বাকি ৮৮ শতাংশ কাজ কীভাবে সম্পন্ন হবে, তার বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা জরুরি।
২০২০ সালের নভেম্বরে অনুমোদিত প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল চার হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। পরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৬২৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রায় ৫৮ শতাংশ ব্যয় বেড়েছে। অথচ কাজের অগ্রগতি একেবারেই সন্তোষজনক নয়। এই গতিতে চললে ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার চিন্তা একেবারেই অবাস্তবসম্মত চিন্তা।
প্রকল্পের পথে জমি অধিগ্রহণ, স্থাপনা অপসারণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের মতো বাস্তব জটিলতা রয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু এসব সমস্যা নতুন নয়। প্রকল্প গ্রহণের সময়ই এগুলো চিহ্নিত করার কথা। তাহলে কেন কাজ শুরুর আগে ভূমি ও ইউটিলিটি-সংক্রান্ত প্রস্তুতি যথেষ্ট এগিয়ে নেওয়া হলো না? একটি বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের নির্মাণকাজ বছরের পর বছর থমকে থাকার পর এসব সমস্যাকে অগ্রগতির প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই সামনে আনে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রকল্পের বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে ব্যয় হচ্ছে। সংশোধিত হিসাবে এ খাতে বরাদ্দ প্রায় দুই হাজার ৮০২ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৪২ শতাংশের বেশি। জেলা প্রশাসনের হিসাবে অধিগ্রহণের ৭০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করা হলেও নির্মাণকাজে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। তাই কত জমি অধিগ্রহণ হয়েছে, কত অর্থ পরিশোধ হয়েছে এবং ঠিকাদারদের কতটুকু জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য প্যাকেজভিত্তিকভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।
ভূমি অধিগ্রহণের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার যে তথ্য এসেছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারি অধিগ্রহণমূল্য ও বাজারদরের পার্থক্য থাকলেই অনিয়ম প্রমাণিত হয় না; তবে স্থাপনার অতিমূল্যায়নসহ নির্দিষ্ট অভিযোগ উঠে থাকলে তার স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত জরুরি। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রকল্পে একটি টাকাও যেন অনিয়মের মাধ্যমে অপচয় না হয়, তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
বিশ্বব্যাংকের অসন্তোষ এবং প্রায় এক হাজার ৯০০ কোটি টাকার ছাড় স্থগিত থাকার বিষয়টিও উদ্বেগজনক। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না, সে সিদ্ধান্তের আগে বাংলাদেশকে স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা দিতে হবে। শুধু মেয়াদ বাড়িয়ে একই ধীরগতির প্রকল্প চালিয়ে যাওয়ার অর্থ হতে পারে আরও ব্যয়, আরও জনদুর্ভোগ এবং আরও অনিশ্চয়তা।
এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন লাখো মানুষ ও হাজারো পণ্যবাহী যান চলাচল করে। নির্মাণকাজের ধীরগতিতে সড়কের বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ ও উঁচুনিচু হয়ে গেছে। ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা ও জনভোগান্তি। উন্নয়নের নামে বছরের পর বছর দুর্ভোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এই সম্পাদকীয় যখন লেখা হচ্ছে, তখনও সুবর্ণভূমি অনলাইনে একটি রিপোর্ট সামনে রয়েছে, যেখানে বলা হচ্ছে, সড়কটিতে বাস উল্টে অন্তত ২০ যাত্রী আহত হয়েছেন। সড়কের এই বেহাল দশা বছরের পর বছর চলতে পারে না।
এখন প্রয়োজন অগ্রগতির বাস্তবসম্মত সময়সূচি, প্যাকেজভিত্তিক কাজের হিসাব, ভূমি অধিগ্রহণের স্বচ্ছ তথ্য এবং ঠিকাদারদের জবাবদিহি। ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব না হলে তা আগেভাগেই বাস্তবতার আলোকে জানাতে হবে। তবে মেয়াদ বাড়ানো হলে তার সঙ্গে অবশ্যই তার যৌক্তিকতা, নির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা এবং কাজ শেষ করার নতুন সময়সূচি উল্লেখ থাকতে হবে।
ছয় লেনের মহাসড়ক শুধু একটি নির্মাণ প্রকল্প নয়; এটি জনগণের অর্থ, সময় ও প্রত্যাশার প্রতিফলন। তাই প্রকল্পটি যেন আরেকটি দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি ও জনদুর্ভোগের উদাহরণ না হয়, এখনই সে বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।