তাহানী আক্তার
স্কুলের টিনএজ শিক্ষার্থীদের নিয়ে কর্মশালার শেষের দিকে বাচ্চাদের প্রশ্ন-উত্তর থাকে। আপনি অভিভাবক হিসেবে মনে করতে পারেন আমার বাচ্চা তো ঠিক আছে। আমরা তো আমার বাচ্চার কাছে ভালো বাবা-মা। কিন্তু যখন আপনি তার নাম প্রকাশ না করে তার মনের কথা লিখতে বলবেন, অনেক বাচ্চার মধ্যে তখন সে নিজেকে সেভ ফিল করে, যেহেতু তার নামটি কেউ জানতে পারবে না! তখন দেখতে পারবেন আপনি কেমন প্যারেন্টিং করেছেন বা আপনার নামে হয়তো অসংখ্য অভিযোগ বাচ্চার কাছে।
বাচ্চাদের লেখাপড়া যেন চাপের না হয় লেখাপড়ায় চাপ দেওয়া পারিবারিক অ্যাবিউজিংয়ের জন্য যেন তার মন থেকে আপনার প্রতি দায়িত্ব ছাড়া আর সব মায়া-মমতা উঠে না যায়। আবার এমনও অনেক প্রশ্ন আছে তাদের যেগুলো বাবা-মা হিসেবে আপনাকে পড়ে শোনালে মনে করবেন, আপনার বাচ্চাকে লেখাপড়া করানোর আগে ভালো মানুষ বানানো দরকার। আর সব চেয়ে অ্যালার্মিং হচ্ছে আত্মহত্যার মতো ডিসিশন, নেশায় আসক্তি- এই ধরনের পথে যেতেও তারা ভয় পাচ্ছে না। বেঁচে থাকার মতো সুন্দর পৃথিবীতে আর কিছু নেই। আগে বাচ্চার বন্ধু হোন, বাবা-মা পরে হোন।
টিনএজ মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড এডিকশন প্রিভেনশন
অভিভাবকের যে বিষয়গুলো বিশেষভাবে খেয়াল রাখা জরুরি
১. বিচার না করে শুনুন
‘তুমি এসব কেন করছ?’ না বলে বলুন, ‘কিছু নিয়ে কি তোমার মন খারাপ? চাইলে আমাকে বলতে পারো।’
সন্তান যেন মনে না করে, সত্য বললেই বকা বা শাস্তি হবে।
২. আচরণের পরিবর্তন লক্ষ্য করুন। হঠাৎ অতিরিক্ত রাগ, চুপচাপ হয়ে যাওয়া, পড়াশোনায় বড় পরিবর্তন, ঘুমের পরিবর্তন, পরিবার থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া বা নতুন ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এসবকে অবহেলা না করে শান্তভাবে খোঁজ নেওয়া দরকার। পরিবার ও কাছের মানুষকে উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও হতাশা কাটিয়ে উঠতে কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নিন।
৩. বন্ধুত্ব ও সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কে জানুন। বন্ধুদের নিষেধ করার চেয়ে সন্তান কার সঙ্গে সময় কাটায়, কোথায় যায় এবং অনলাইনে কী ধরনের সামাজিক পরিবেশে থাকে এসব সম্পর্কে স্বাভাবিক আগ্রহ রাখুন।
৪. ঘরে স্পষ্ট কিন্তু যুক্তিসঙ্গত সীমা রাখুন। সময়, পড়াশোনা, বাইরে যাওয়া, অনলাইন ব্যবহার এসব বিষয়ে নিয়ম থাকবে। তবে নিয়মের সঙ্গে কারণ ও আলোচনা থাকা জরুরি।
৫. মানসিক চাপকে ‘বয়সের ব্যাপার’ বলে উড়িয়ে দেবেন না। পরীক্ষা, ফলাফল, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক, পরিবারে সমস্যা, বুলিং, নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধা- কিশোরের কাছে এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
৬. সন্তানের সম্মানকে নম্বরের সঙ্গে বেঁধে দেবেন না। ‘তুমি কত পেয়েছ?’- এমন প্রশ্নের পাশাপাশি জিজ্ঞেস করুন, ‘আজ তোমার দিনটা কেমন গেল?’, ‘কোন বিষয়টা তোমাকে সবচেয়ে বেশি চাপ দিচ্ছে?’
৭. নিজের আচরণ দিয়েও উদাহরণ তৈরি করুন। বাড়ির বড়রা কীভাবে রাগ, চাপ, হতাশা ও সমস্যা সামলান, সন্তান সেখান থেকেও শেখে। ইতিবাচক ইতিবাচক প্যারেন্টিং, বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক উন্নত করার জন্য আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)-এর প্যারেন্টিং গাইডলাইনসেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে কাউন্সেলিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ
খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কাউন্সেলিং মানেই সন্তান ‘সমস্যাগ্রস্ত’ বা ‘নেশাগ্রস্ত’ এমন নয়। প্রিভেন্টিভ কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে একজন কিশোর-কিশোরী শিখতে পারে নিজের আবেগ চিনতে, পিয়ার প্রেশার (দলগত ইতিবাচক/নেতিবাচক চাপ) সামলাতে, ‘না’ বলতে মানসিক চাপ, হতাশা মোকাবিলা করতে, সমস্যা হলে সাহায্য চাইতে, নিজের সিদ্ধান্তের পরিণতি বুঝতে, পরিবার ও অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইনে বয়ঃসন্ধিকালে মানসিক-শারীরিক নির্দেশনায় সাইকো সোশ্যাল ইন্টারভেনশনকে মানসিক সুস্থতা বাড়ানো এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ কমানোর গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু সন্তানের কাউন্সেলিং নয়, প্যারেন্ট কাউন্সেলিং/প্যারেন্ট গাইডলাইনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক সময় সন্তানকে বদলানোর আগে অভিভাবককে শিখতে হয় কীভাবে শুনতে হবে, কীভাবে সীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং কীভাবে কঠিন বিষয়ে কথা বলতে হবে। ইউনিসেফ-এর কেয়ারগিভার গাইডেন্সে যোগাযোগ, মতভেদ, দ্বন্দ্ব বা সমস্যা মোকাবিলা, সীমা নির্ধারণ এবং বয়ঃসন্ধিকালে উত্তরণ বোঝার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইউনিসেফের মতে, ‘নেশা প্রতিরোধ শুরু হয় নেশা দেখা দেওয়ার পর নয়, সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করার মাধ্যমে।’
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: শুধু ভয় দেখিয়ে নেশা প্রতিরোধ করা যায় না। সচেতনতা, পারিবারিক সম্পর্ক, ইমোশনাল সাপোর্ট, গ্রহণযোগ্য আচরণ, প্রয়োজনমতো প্রফেশনাল কাউন্সেলিং- এই সমন্বিত পদ্ধতিই বেশি কার্যকর।
লেখক: শিক্ষক, প্রশিক্ষক, মেন্টর স্টুডেন্ট কাউন্সেলর