সম্পাদকীয়
যবিপ্রবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সংকট
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিভাগে প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে নিয়োগ ও পদোন্নতি বন্ধ থাকা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। এটি প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াও সংশ্লিষ্ট বিভাগ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ইঙ্গিত।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের বর্তমান পরিস্থিতি তাই উদ্বেগ জাগায়। প্রতিষ্ঠার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও বিভাগটিতে বর্তমানে কোনো অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক নেই। অথচ সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে মোট ছয়টি পদ শূন্য এবং অন্তত সাতজন শিক্ষকের সহযোগী অধ্যাপক হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে বলে বিভাগীয় সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে সুবর্ণভূমি একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, সমস্যাটির সূত্রপাত একটি নিয়োগ-সংক্রান্ত আইনি জটিলতা থেকে হলেও এর প্রভাব এখন পুরো অ্যাকাডেমিক ব্যবস্থায় পড়ছে। ২০২২ সালে সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং ২০২৩ সালের শুরুতে নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হওয়ার পর একজন আবেদনকারী নিজেকে বঞ্চিত দাবি করে আদালতের দ্বারস্থ হন। সেই রিটের পর থেকে নিয়োগ ও পদোন্নতির কার্যক্রম কার্যত স্থবির। একজন শিক্ষক তার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আদালতে যাবেন—এটি আইনগত অধিকার। কিন্তু সেই আইনি প্রক্রিয়ার নিষ্পত্তি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলে তার দায় শুধু একজন রিটকারীর ওপর বর্তায় না; বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও দায়িত্ব রয়েছে দ্রুত ও কার্যকরভাবে সংকট সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—একটি নিয়োগ বা পদোন্নতি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে একটি পুরো বিভাগ বছরের পর বছর কেন স্থবির থাকবে? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি মনে করে আইনি জটিলতার কারণেই নিয়োগ সম্ভব হচ্ছে না, তাহলে আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে আইনগত ও প্রশাসনিক সমাধানের পথ বের করতে হবে। একটি বিষয়কে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব নয়।
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ শিক্ষার্থীরা। উচ্চশিক্ষার জন্য সুপারিশপত্র পাওয়া থেকে শুরু করে গবেষণা, পিএইচডি তত্ত্বাবধান, বড় গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই বিভাগে পর্যাপ্ত সংখ্যক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক থাকা গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক না থাকায় অ্যাকাডেমিক সুযোগ সংকুচিত হওয়া শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীদের সমস্যা নয়; এর প্রভাব ভবিষ্যৎ গবেষণা ও বিভাগের সামগ্রিক মানের ওপরও পড়বে।
অন্যদিকে, যোগ্যতা অর্জনের পরও দীর্ঘদিন পদোন্নতি না পাওয়া শিক্ষকদের হতাশাও স্বাভাবিক। একজন শিক্ষক বছরের পর বছর একই পদে আটকে থাকলে তার পেশাগত মর্যাদা, কর্মপ্রেরণা এবং গবেষণাকাজ—সবকিছুর ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সিনিয়র শিক্ষক পদোন্নতি না পেলে জুনিয়রদের পদোন্নতির পথও রুদ্ধ হয়ে যায়; একই সঙ্গে নতুন নিয়োগ ও অস্থায়ী শিক্ষকদের স্থায়ীকরণও জটিল হয়ে পড়ে। অর্থাৎ একটি জটিলতা ধীরে ধীরে পুরো বিভাগকে একটি প্রশাসনিক অচলাবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
শিক্ষকদের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বর্জনের সিদ্ধান্তও তাই প্রশাসনের জন্য একটি বার্তা। অবশ্যই শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। তবে তাদের দাবির পেছনে যে দীর্ঘদিনের হতাশা জমেছে, প্রশাসনের তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
আমরা মনে করি, এখন আর আশ্বাসে বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে আইনি জটিলতা নিরসন, শূন্য পদে নিয়োগ এবং যোগ্য শিক্ষকদের পদোন্নতির কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে আদালতে বিচারাধীন বিষয়কে সম্মান করে আইনসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা কীভাবে নেওয়া যায়, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একজনের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষার অধিকার ও একটি বিভাগের ভবিষ্যৎও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যবিপ্রবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার অবসান এখন সময়ের দাবি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে প্রমাণ করতে হবে, আইনি জটিলতা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাকাডেমিক ভবিষ্যৎ থামিয়ে রাখার স্থায়ী অজুহাত হতে পারে না।