সম্পাদকীয়
বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন বাংলাদেশের হাজারো তরুণের। সেই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, জমি-গরু বিক্রি, মায়ের গহনা বন্ধক রাখা, এমনকি এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত। আর এই স্বপ্নকেই যখন প্রতারণার পুঁজি বানিয়ে কেউ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়, তখন তা সংশ্লিষ্ট নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর কেমন প্রভাব ফেলে, তা আমরা সহজেই বুঝতে পারি।
সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ‘আজাহার ইন্টারন্যাশনাল ওভারসিজ’-এর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক এবং একই সঙ্গে ভয়াবহ। সার্বিয়ায় আকর্ষণীয় বেতনে চাকরির প্রলোভন, ভুয়া ভিসা ও জাল কাগজপত্র দেখিয়ে শতাধিক মানুষের কাছ থেকে প্রায় তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আজাহার উদ্দীনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা নেওয়ার পর তিনি বিদেশে চলে গেছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, প্রতারণার শিকার হয়েছেন তারই প্রতিষ্ঠানের কর্মী, এমনকি নিকটাত্মীয়রাও।
চাঁদপুরের মতলব উত্তর এলাকার ১২ জনের কাছ থেকে ৬৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ, আবার ৬২টি পাসপোর্টের বিপরীতে দুই কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ— এসব তথ্য কেবল অর্থ আত্মসাতের পরিমাণ বোঝায় না; এর মাধ্যমে বোঝা যায়, একটি প্রতারণার নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত হতে পারে। প্রত্যেকটি টাকার পেছনে রয়েছে একজন মানুষের শ্রম, একটি পরিবারের আশা এবং একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
বৃদ্ধ দর্জি হুমায়ুন কবীর লিটনের বক্তব্য তাই আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো। একমাত্র ছেলেকে ইউরোপে পাঠিয়ে সংসারে সচ্ছলতা আনার আশায় ঋণ করে টাকা দিয়েছেন। এখন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পাওনাদারের ভয়ে নিজ বাড়িতেই ফিরতে পারছেন না। একজন মানুষের বিদেশযাত্রার স্বপ্ন কীভাবে তাঁকে ‘পথের ভিখারিতে’ পরিণত করতে পারে, এই ঘটনা তার নির্মম উদাহরণ।
আরও উদ্বেগজনক হলো, অভিযোগকারীদের পাওনা আদায়ের দাবিকে ‘চাঁদাবাজি’ হিসেবে প্রচার করার অভিযোগ। সত্যিই যদি নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধেই নতুন নাটক সাজানো হয়ে থাকে, তবে তা প্রতারণার পর আরও একটি গুরুতর অন্যায়। কোনো পক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব যেন তদন্তের পথে বাধা না হয়— এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
এখানে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ, মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও জাল ভিসার মতো গুরুতর বিষয় সামনে আসার পর তদন্ত যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। অভিযুক্ত ব্যক্তি বিদেশে অবস্থান করলে তাকে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়াও সক্রিয় করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের পাসপোর্ট উদ্ধার, অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ এবং মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্নকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রতারক চক্রের কার্যক্রম বন্ধে শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতা যথেষ্ট নয়। লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যক্রম কঠোরভাবে নজরদারি, ভুয়া ভিসা শনাক্তে কার্যকর ব্যবস্থা এবং প্রতারণার ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
মানুষের স্বপ্ন বিক্রি করে কেউ যেন কোটি টাকার মালিক হতে না পারে, তা দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন কোনো অপরাধ নয়; বরং সেই স্বপ্নকে প্রতারণার ফাঁদে পরিণত করাই অপরাধ। আজাহার উদ্দীনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মধ্য দিয়ে শুধু একজন অভিযুক্তের বিচার নয়, বিদেশ পাঠানোর নামে দেশজুড়ে সক্রিয় থাকা প্রতারক চক্রগুলোকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হোক।