যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ভিসা প্রতারণা

শতাধিক ব্যক্তির তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

রায়হান সিদ্দিক

, যশোর

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
শতাধিক ব্যক্তির তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

‘ঢাকা থেকে যশোর আসার বাস ভাড়াটুকুও ছিল না। মানুষের কাছ থেকে ধার করে এসেছি। একমাত্র ছেলেটাকে ইউরোপ পাঠিয়ে সংসারে একটু সচ্ছলতা আনতে চেয়েছিলাম। এনজিওর ঋণ আর সুদে চার লাখ টাকা দিয়ে আজ আমি পথের ফকির। পাওনাদারদের ভয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জের মুসলিমনগরের বাড়িতে থাকতে পারি না, পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’ চোখের পানি মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন বৃদ্ধ দর্জি হুমায়ুন কবীর লিটন।

ইউরোপের দেশ সার্বিয়ায় আকর্ষণীয় বেতনে চাকরির প্রলোভন এবং ভুয়া ভিসা দেখিয়ে তার মতো শতাধিক মানুষের কাছ থেকে প্রায় তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘আজাহার ইন্টারন্যাশনাল ওভারসিজ’-এর স্বত্বাধিকারী আজাহার উদ্দীনের বিরুদ্ধে।

জাল কাগজপত্র ও ‘কন্ট্রাক্ট ম্যানপাওয়ার’ দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের বিশ্বাস অর্জনের পর বিপুল অর্থ নিয়ে ইতিমধ্যে বিদেশে চম্পট দিয়েছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই চক্রের জালিয়াতির শিকার হয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার শতাধিক পরিবার এখন নিঃস্ব। চাঁদপুরের মতলব উত্তর থানা এলাকা থেকেই ১২ জন প্রবাসপ্রত্যাশী জমা দিয়েছেন ৬৫ লাখ টাকা। আমিরুল ইসলাম নামে আরেক আদম ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৬২টি পাসপোর্টের জন্য নিয়েছেন দুই কোটি টাকা।

ভুক্তভোগী চাঁদপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ গোলাম হোসেন বলেন, ‘আমাদের মতলব থেকে ১২ জন মিলে ৬৫ লাখ টাকা দিছি। কেউ গরু বেচে, কেউ সুদে এনে, আবার কেউ মায়ের গহনা বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করেছিল। আজাহার বলেছিল, ভিসা আসল। কিন্তু অনলাইনে চেক করে দেখি সব ভুয়া। কথার সাথে কাজের কোনো মিল রাখেনি।’

অন্য এক ভুক্তভোগী জানান, জালিয়াতি ঢাকতে নতুন নতুন অজুহাত তৈরি করতেন আজাহার । তিনি বলেন, প্রথমে অনলাইনে স্টিকার ভিসা দেখিয়ে সব টাকা দাবি করা হয়।

‘আমরা বলি, পাসপোর্ট হাতে পাবো, স্টিকার যাচাই করবো, তারপর বাকি টাকা দেবো। কিন্তু এর পর থেকেই আজাহার লাপাত্তা। বাধ্য হয়ে ঢাকার আদালতে মামলা করেছি। আদালত আজাহার সহ চারজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন,’ বলছিলেন তিনি।

এলএম ট্রেডার্সের সত্বাধিকারী আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘৬২টি পাসপোর্ট জমা দিয়েছি। আমার কাছ থেকে দুই কোটি টাকা নিয়েছে। কিন্তু কাজ করেনি। পরে আদালতের মাধ্যমে স্ট্যাম্প করি। কিন্তু এরপর থেকে আজাহার বিদেশে পালিয়ে গেছে। এখন আমি যাত্রীদের পাসপোর্ট কিংবা টাকা কিছুই ফেরত দিতে পারছি না।’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই প্রতারণার জাল এতোটাই বিস্তৃত ছিল যে, নিজের প্রতিষ্ঠানের কর্মরত এবং নিকটাত্মীয়দেরও ছাড় দেননি আজাহার ।

‘আজাহার ইন্টারন্যাশনাল ওভারসিজ’-এর ম্যানেজার মাহমুদুল হাসান নিজেও ভুক্তভোগী। তিনি বলেন, ‘সেখানে দুই বছর চাকরি করেছি। ভুয়া ভিসা দিয়ে আমার কাছ থেকেই ছয় লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এমনকী শতাধিক মানুষের মূল পাসপোর্ট আটকে রেখে সে উধাও হয়ে গেছে। উনার শ্যালক ছিলেন প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, তাকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল, বর্তমানে জামিনে আছে।’

একইভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন আজাহারের ভাগনে বেল্লাল হোসেনও। তিনি জানিয়েছেন, ভালো বেতনের আশ্বাস দিয়ে কাজে রেখেছিলেন আজাহার । কিন্তু একমাসের বেতনও তিনি ঠিকভাবে পাননি। উলটো কথিত ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ দিয়ে তাকেও বিপাকে ফেলেছেন।
বেল্লাল বলেন, ‘দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলাম। হঠাৎ একদিন মামা বললেন, বিদেশে বসে এতো কষ্ট করা লাগবে না। দেশে চলে এসে আমার ব্যবসার দেখভাল করো। ভালো টাকা বেতন পাবা। কিন্তু দেশে এসে বেতনতো পাইনি, এখন তার অপকর্মের দায় আমার উপর এসে পড়েছে।

অপরাধ ঢাকতে সাজানো হয় ‘চাঁদাবাজি’ নাটক

কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে চম্পট দেওয়ার পর পাওনাদারদের হাত থেকে বাঁচতে প্রতারক পরিবারটি গ্রহণ করে নজিরবিহীন কৌশল। গত মঙ্গলবার বিকেলে যশোর উপশহর এলাকায় আজাহারের বাড়িতে ‘দুর্বৃত্তরা আটকে রেখে কোটি টাকা চাঁদা দাবি করছে’ এবং ‘প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে’ বলে প্রচার করেন তার স্ত্রী পাপিয়া বেগম।

সংবাদকর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলে পাপিয়া বেগম দাবি করেন, চাঁদা না দিলে তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। তবে, অনুসন্ধানে প্রকাশ পায়, সেখানে কোনো চাঁদাবাজ বা দুর্বৃত্ত যায়নি; মূলত সর্বস্ব হারানো ভুক্তভোগীরা নিজেদের পাওনা টাকা আদায়ে জড়ো হয়েছিলেন। নিজেদের অপরাধ ঢাকতে উল্টো জেলা যুবদলের আহ্বায়ক এম তমাল আহমেদসহ স্থানীয় রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মিথ্যা অভিযোগ এনে ব্ল্যাকমেইল করার অপচেষ্টাও চালানো হয়।

এ বিষয়ে যশোর জেলা যুবদলের আহ্বায়ক এম তমাল আহমেদ বলেন, প্রতারক আজাহার ও তার পরিবার বিশাল এই জালিয়াতি আড়াল করতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জড়িয়ে নাটক সাজিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে তারা শত শত মানুষের স্বপ্ন ভেঙে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে আজাহার উদ্দীন বিদেশে অবস্থানকালে ফোনে সুবর্ণভূমিকে জালিয়াতির কথা অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি সবার পাসপোর্ট ফেরত দিয়েছেন।
এদিকে, আইনগত ব্যবস্থার বিষয়ে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন বলেন, অভিযুক্ত আজাহার উদ্দীন ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে প্রতারণার একাধিক অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশনা ও ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে। অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)