বাগেরহাট প্রতিনিধি
মোংলা-ঘোষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেলের তীব্র নদীভাঙনে বাগেরহাটের রামপালের বিস্তীর্ণ জনপদ এখন অস্তিত্বের সংকটে। বছরের পর বছর নদীর ভাঙনে শতাধিক পরিবার হারিয়েছে বসতভিটা। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও দেড় শতাধিক পরিবার। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে কয়েক কিলোমিটার পাকা সড়ক, বসতবাড়ি, ফসলি জমি, যাত্রীছাউনি ও বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙনের মুখে রয়েছে উপজেলা পর্যায়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাও।
নদীর তীরবর্তী মানুষজনের অনেকেই ঘরবাড়ি হারিয়ে সরকারি রাস্তার পাশে, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে কিংবা অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। কারও কারও বসতভিটা এখন নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। যেকোনো সময় নতুন করে ভাঙন দেখা দিলে সেসব পরিবারও ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রমজাইপুর, সিংগড়বুনিয়া, পেড়িখালী, ওড়াবুনিয়া ও হুড়কা এলাকার কয়েকটি পয়েন্টে ভাঙন তীব্র হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, চ্যানেলের একাধিক পয়েন্টে ভাঙন চলছে এবং কয়েকটি স্থানে প্রতিরোধকাজ শুরু হয়েছে। বড় ভাঙনস্থলগুলোতে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব পরিবার রামপালের পেড়িখালী ইউনিয়নের রোমজাইপুর এলাকায় নদীতে বিলীন হয়েছে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবারের বসতবাড়ি। সিংগড়বুনিয়ার রামপাল খেয়াঘাটের যাত্রীছাউনিও ভাঙনের কবলে পড়ে নদীতে বিলীন হয়েছে। এতে নৌপথে যাত্রী পারাপারে ভোগান্তি বেড়েছে।
ওড়াবুনিয়া এলাকায় রামপাল কৃষি অফিস থেকে বগুড়া ব্রিজ পর্যন্ত নদীভাঙনে প্রায় ৪০টি পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। আরও ২৫ থেকে ৩০টি পরিবার রয়েছে ঝুঁকিতে। একই এলাকায় উপজেলা কৃষি অফিস ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসও ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।
হুড়কা ইউনিয়নের গোলারডাঙ্গি এলাকায় নদীভাঙনে আরও ১৫ থেকে ২০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে অন্তত ২০ থেকে ২৫টি পরিবার।
নদীর পেটে সরকারি স্থাপনাও রামপালে স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থার জন্য ২০২০ সালে ২১ লাখ ৫৫ হাজার ১২৬ টাকা ব্যয়ে ৬২০ মিটার দীর্ঘ একটি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই তীব্র নদীভাঙনে এর বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নদীগর্ভে চলে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
চ্যানেল খনন ও ভাঙন নিয়ে প্রশ্ন মোংলা-ঘোষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেল সচল রাখার লক্ষ্যে ২০১১-১২ অর্থবছরে খননকাজ শুরু হয়। চ্যানেলটি মোংলা বন্দর, সুন্দরবন ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নৌ যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ, চ্যানেলের আওতাভুক্ত খাল ও নদীগুলোর খনন পরিকল্পনা নিয়ে যথেষ্ট সমন্বয় হয়নি। তাদের দাবি, পানির প্রবাহের পরিবর্তন ও নদীর স্বাভাবিক গতিপথে প্রভাব পড়ার কারণে কয়েকটি এলাকায় ভাঙন বেড়েছে।
মোংলা-ঘোষিয়াখালী চ্যানেল রক্ষা সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব এমএ সবুর রানা বলেন, চ্যানেলের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা ও ভাঙন রোধে পরিকল্পিত গবেষণা প্রয়োজন। নদীতীরবর্তী গ্রাম ও কৃষিজমি রক্ষায় টেকসই ব্লক বাঁধ বা বেড়িবাঁধ নির্মাণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল বলেন, মোংলা-ঘোষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেলের রামপাল অংশে ভাঙনের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি। বর্তমানে চ্যানেলের পাঁচ-ছয়টি পয়েন্টে ভাঙন রয়েছে। এরই মধ্যে তিনটি পয়েন্টে কাজ শুরু হয়েছে। বড় ভাঙনস্থলগুলোতে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।