যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

যশোর-ঝিনাইদহ ছয় লেন মহাসড়ক

সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অনিশ্চয়তা

শাহারুল ইসলাম ফারদিন

, যশোর

প্রকাশ : শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অনিশ্চয়তা

ছয় বছর ধরে চলা যশোর-ঝিনাইদহ ছয় লেন মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বরেই প্রকল্পের বর্ধিত মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। অথচ, যশোরের চাঁচড়া মোড় থেকে ঝিনাইদহ পর্যন্ত ৪৭ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার কাজের বড় অংশ এখনো বাকি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পের অগ্রগতি ছিল প্রায় দুই শতাংশ। সাত মাসে তা বেড়েছে ১০ শতাংশ পয়েন্ট। ফলে, ডিসেম্বরের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল চার হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ দুই হাজার ৭৮৭ কোটি এবং সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা। পরে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৬২৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে দুই হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা বা প্রায় ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ। ৪৭ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার সড়কের হিসাবে প্রতি কিলোমিটারে প্রাথমিক গড় ব্যয় ছিল প্রায় ৮৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা। সংশোধিত ব্যয়ে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৩৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চারটি প্রধান লেন ও দুটি সার্ভিস লেনসহ মোট ছয় লেনে সড়কটি উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রকল্পটি তিনটি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম প্যাকেজের দায়িত্বে রয়েছে এমএস এভারেস্ট বিজি সিএল জেভি চীন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে আবদুল মোনায়েম লিমিটেড এএমএল ওটিপিসি জেভি।

প্রকল্পের কাজ ২০২১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর করা হয়। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শুরুতে এসে হাতে সময় আছে প্রায় চার মাস। এই সময়ে ৮৮ শতাংশ কাজ শেষ করতে হলে বর্তমান গতির তুলনায় কয়েকগুণ গতি বাড়াতে হবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, প্রথম প্যাকেজে অগ্রগতি প্রায় ১০ শতাংশ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্যাকেজে কাজের অগ্রগতি প্রায় দুই শতাংশ। জমি অধিগ্রহণ, স্থাপনা অপসারণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের কারণে এসব এলাকায় কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী নিলন আলী বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ ও ওজোপাডিকোর বৈদ্যুতিক লাইন স্থানান্তরের কাজ চলছে। স্থাপনা, গাছ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের সমস্যাগুলো সমাধান হলে কাজের গতি আরও বাড়বে। তারা পরিকল্পিতভাবেই এগোচ্ছেন।

যশোর অংশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, অনেক স্থানে জমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। কোথাও সড়কের অংশবিশেষ খুঁড়ে রাখা হয়েছে। ফলে বিদ্যমান সড়ক দিয়েই ভারী যানবাহন চলাচল করছে। এতে বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ ও উঁচুনিচু অবস্থা তৈরি হয়েছে।

ইজিবাইক চালক কামরুল ইসলাম বলেন, ছোট গাড়িতে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাই কঠিন। ট্রাকচালক ইদ্রিস আলী বলেন, ছয় সাত বছর ধরে সড়কটির উন্নয়নের কথা বলা হলেও কাজ শেষ হয়নি। মোটরসাইকেল আরোহী আব্দুর রহিম বলেন, এই সড়কে চলাচল করলেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।

যশোর সড়ক পরিবহন শ্রমিক সমিতির সভাপতি মামুনুর রশীদ বাচ্চু বলেন, উন্নয়ন কাজের নামে বছরের পর বছর মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। তার মতে, পরিকল্পনার চেয়ে অদক্ষ বাস্তবায়নই এখন বড় সমস্যা।

প্রকল্পের ব্যয়ের বড় অংশ ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে। সংশোধিত হিসাবে সড়ক নির্মাণে দুই হাজার ৪৯০ কোটি, ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে দুই হাজার ৮০২ কোটি এবং অন্যান্য খাতে প্রায় এক হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, মোট ব্যয়ের প্রায় ৪২ দশমিক ৩ শতাংশই ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসনের হিসাবে অধিগ্রহণের ৭০ শতাংশ অর্থ ইতিমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে।

তবে ভূমি অধিগ্রহণ নিয়েই উঠেছে অনিয়মের অভিযোগ। জেলা প্রশাসনের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে জমির মূল্য নির্ধারণ ও অধিগ্রহণে বিভিন্ন অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে প্রতি শতক জমির মূল্য চার হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও স্থানীয় বাজারে একই জমির দাম ছিল ১০ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি মূল্য ও বাজারদরের পার্থক্য প্রতি শতকে প্রায় ৯ লাখ ৯০ হাজার থেকে ১৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকা।

তবে বাজারদর ও আইনগত অধিগ্রহণমূল্য সরাসরি সমান নয়। তাই এই পার্থক্য একাই অনিয়মের প্রমাণ নয়। তদন্তে উত্থাপিত অভিযোগের পৃথক যাচাই প্রয়োজন। তদন্ত প্রতিবেদনে খয়েরতলা, শিবনগর, নিশ্চিন্তপুর, কাশিপুর, আড়পাড়া ও দুলালমুন্দিয়া মৌজার অন্তত ৩৬টি স্থাপনা অতিমূল্যায়নের কথাও বলা হয়েছে। তালিকায় ফাস্টফুড স্টোরেজ, সোলালি বস্ত্র বিতান, তারা অ্যাগ্রো রাইস মিল ও দীপালি ক্যাফেটেরিয়ার নাম রয়েছে।

এদিকে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকও অসন্তোষ জানিয়েছে। গত ১৯ জুলাই বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডাইরেক্টর জোঁ পেম ও অপারেশন ম্যানেজার গেইল মার্টিন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। তারা জানান, ডিসেম্বর ২০২৬ সালে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না, তা বিশ্বব্যাংকের পরবর্তী সভায় সিদ্ধান্ত হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অগ্রগতি সন্তোষজনক না হওয়ায় প্রায় এক হাজার ৯০০ কোটি টাকার অর্থছাড় স্থগিত রয়েছে। ঋণের মেয়াদ ও অর্থায়ন বাড়াতে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা চলছে।

আবদুল মোনায়েম লিমিটেডের প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মঞ্জুর হাসান বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে কাজ দৃশ্যমান হয়নি। নতুন করে আলোচনার মাধ্যমে অর্থায়ন পুনর্বিন্যাস করে কাজ শুরু করার চেষ্টা চলছে।

অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের হিসাবে অধিগ্রহণের ৭০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ হলেও নির্মাণকাজে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। ফলে কোন অংশে কত জমি অধিগ্রহণ বাকি, কত অর্থ পরিশোধ হয়েছে এবং অর্থ পরিশোধের বিপরীতে কতটুকু জমি ঠিকাদারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার প্যাকেজভিত্তিক হিসাব প্রকাশের দাবি উঠেছে।

হিসাব অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অগ্রগতি বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট। কিন্তু ডিসেম্বরের মধ্যে শতভাগে যেতে হলে আরও ৮৮ শতাংশ কাজ করতে হবে। চার মাসে তা করতে হলে প্রতি মাসে গড়ে ২২ শতাংশীয় পয়েন্ট অগ্রগতি প্রয়োজন। একই সময়ে প্রকল্পের ব্যয় চার হাজার ১৮৭ কোটি থেকে বেড়ে ছয় হাজার ৬২৬ কোটি টাকা হয়েছে। ফলে বাড়তি দুই হাজার ৪৩৯ কোটি টাকার পাশাপাশি সময় বাড়লে ব্যয় আরও বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)