সম্পাদকীয়
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। নদী, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে যার সম্পর্ক খুবই গভীর। সেই ইলিশের দেশেই এখন বিপুল পরিমাণ ইলিশ পাশের দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে। প্রশ্ন তাই শুধু বিদেশি ইলিশ আমদানির নয়; প্রশ্ন হলো, যে দেশে একসময় ইলিশের উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছিল, সেখানে এখন ইলিশের মৌসুমেও কেন বিদেশের মাছের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে?
বেনাপোল স্থলবন্দরের তথ্য উদ্ধৃত করে সুবর্ণভূমির নিজস্ব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভারত থেকে তিন লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে আগস্টেই এসেছে তিন লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি। আমদানি করা মাছের ঘোষিত মূল্য প্রায় ছয় কোটি ৯৩ লাখ টাকা; গড়ে প্রতি কেজির ঘোষিত মূল্য প্রায় ১৯৬ টাকা।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে— বাংলাদেশে আসা এসব ইলিশের বড় অংশই ভারতের গুজরাট থেকে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে। গুজরাটে ইলিশের উৎপাদন বাড়ায় সেখানে উদ্বৃত্ত সরবরাহ ও কম দামের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশি বাজারে ঢুকছে এই মাছ।
বৈধ বাণিজ্যের মাধ্যমে বিদেশি ইলিশ আসতেই পারে। এতে আপত্তির কারণ নেই। বরং কম দামে ভোক্তার কাছে মাছ পৌঁছানো বাজারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন আমদানি করা মাছের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
যশোরের বাজারে আমদানি করা ইলিশের একটি অংশকে কোনো কোনো বিক্রেতা ‘মিয়ানমারের ইলিশ’ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ বেনাপোলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আমদানি করা ইলিশ আসলে ভারতীয়। তাহলে একই মাছের পরিচয় নিয়ে এই বিভ্রান্তি কেন? এর উত্তর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।
গত ২২ জুলাই সাদা মাছের ঘোষণা দিয়ে প্রায় ৩৬০ কেজি ইলিশ আনার ঘটনাও ধরা পড়েছে। পরিমাণটি মোট আমদানির তুলনায় নগণ্য হলেও ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি চালানে ঘোষণার গরমিল ধরা পড়লে পুরো আমদানি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
তবে এর চেয়েও বড় প্রশ্ন বাংলাদেশের নিজস্ব ইলিশ উৎপাদন নিয়ে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল পাঁচ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে পাঁচ লাখ ২৯ হাজার টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাঁচ লাখ চার হাজার টনে নেমেছে। অর্থাৎ উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। একই সময়ে ইলিশের গড় ওজন কমার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
নদী ও মোহনা দূষণ, জাটকা নিধন, ক্ষতিকর জাল ব্যবহার, বালু উত্তোলন, কীটনাশকের প্রভাব এবং ইলিশের অভিবাসনপথে প্রতিবন্ধকতার মতো কারণের কথা বিশেষজ্ঞরা বলছেন। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় ২০২০ সালে ছয় বছর মেয়াদি প্রায় ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্পও নেওয়া হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এত অর্থ ব্যয়ের পরও উৎপাদন কমছে কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে নিরপেক্ষভাবে। প্রকল্পের অর্থ কোথায় খরচ হয়েছে, কী ফল পাওয়া গেছে, কোথায় ব্যর্থতা ছিল— সবকিছুর হিসাব জনসমক্ষে আসা দরকার।
বিদেশি ইলিশ আমদানি হয়তো বাজারের সাময়িক সংকট সামাল দেবে। কিন্তু এটি বাংলাদেশের ইলিশ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার স্থায়ী সমাধান নয়। বরং এখনই সতর্ক না হলে ইলিশের দেশে ইলিশ খাওয়ার জন্য বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
তাই আমদানি বন্ধ নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছ আমদানি ও শক্তিশালী ইলিশ ব্যবস্থাপনা। আমদানি করা মাছের উৎস ও পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে, দেশি বলে বিদেশি মাছ বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সর্বোপরি একই সঙ্গে বাংলাদেশের নদী-জলাশয়কে ইলিশের জন্য নিরাপদ করতে হবে।
ইলিশের সংকটকে শুধু বাজারের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আমাদের নদী, পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ এবং নীতিনির্ধারণের সংকটেরও প্রতিচ্ছবি। এখনই সেই সংকটের গভীরে যাওয়া না গেলে ভবিষ্যতে ‘ইলিশের দেশ’ পরিচয়টি শুধু স্মৃতিতেই থেকে যেতে পারে।