যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

মক্কা চুক্তি: কোন পথে বাংলাদেশ

মাহমুদ সাকী

প্রকাশ : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১২:০০ পিএম
মক্কা চুক্তি: কোন পথে বাংলাদেশ

ভূরাজনীতিতে কোনো চুক্তি কেবল একটি স্বাভাবিক চুক্তিই হয়ে থাকে না। তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে একটি দেশের বাণিজ্য, নিরাপত্তা, কূটনীতি, এমনকি সেই সকল দেশের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থানেও। মহানবীর স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র নগরী মক্কায় সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যকার যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি তাই শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্য বা মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন মাত্রাই যোগ করেনি, এটি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতেও সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামোয় বাংলাদেশের অবস্থান আসলে কী হবে?

ঢাকার পক্ষ থেকে চুক্তিটির বিষয়ে ইতিবাচক আগ্রহের কথা ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন আর দূরবর্তী কোনো ভূরাজনৈতিক সমীকরণের পর্যবেক্ষণমাত্র নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে এর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তবে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রথমেই একটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশের জন্য মক্কা চুক্তি কেবল ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়, আবার এটিকে নিছক একটি সামরিক জোটের প্রশ্ন হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সৌদি আরবের শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনা, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা, ভারতের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের বহুপক্ষীয় পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা। অতএব, সিদ্ধান্তটি আবেগের ভিত্তিতে নয়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিস্তৃত পরিমণ্ডল বিবেচনায় নিয়েই নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের গুরুত্বের জায়গাটি এখানে বিশেষভাবে বিবেচ্য। সৌদি আরব বাংলাদেশের মানুষের কাছে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র নয়, দেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজারও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুধুমাত্র সৌদি আরব থেকেই বাংলাদেশে প্রায় ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। একই সময়ে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অর্থনৈতিক অভিঘাত কেবল রাষ্ট্রীয় হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার ও তাদের জীবনযাত্রাও।

এই বাস্তবতায় মানবসম্পদ রপ্তানিকে কেবল প্রবাসীকল্যাণ বা শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক পরিসরে দেখলে চলবে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মূল্য রয়েছে। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দক্ষ জনশক্তির বাজার সম্প্রসারণ, বাংলাদেশি কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোসহ সব ক্ষেত্রেই দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সম্পর্কের গভীর প্রভাব রয়েছে। অর্থাৎ রিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক যত বেশি আস্থাভিত্তিক ও বহুমাত্রিক হবে, বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ সম্পর্কিত সুযোগও তত বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। একই কথা প্রযোজ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাক। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাসে (জুলাই) দেশের মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে তৈরি পোশাকের রপ্তানি ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের জন্য তাই শুধু শ্রমবাজার নয়, পোশাক, ওষুধ, চামড়া, পাটজাত পণ্য, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের জন্যও একটি সম্ভাবনাময় বাজার।

সরকারের পক্ষ থেকে সৌদি বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর জন্য নতুন খাত চিহ্নিত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তাও এই বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দেয়।

সুতরাং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার পক্ষে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যুক্তি নিঃসন্দেহে শক্তিশালী। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতির হিসাব কখনো একমুখী নয়। একটি সম্পর্ককে যত গভীর করা হয়, অন্য সম্পর্কগুলোর ওপর তার সম্ভাব্য অভিঘাতও তত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

এই জায়গাটিতেই আসে ভারতের আলাপ। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতকে পাশ কাটিয়ে কোনো কৌশলগত সিদ্ধান্তের হিসাব করা কঠিন। দুই দেশের দীর্ঘ স্থল ও নদীসীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং মানুষের চলাচলসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক তাই নিছক কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার একাধিক মৌলিক স্বার্থ প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। অবশ্য সেই সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। সীমান্ত হত্যা, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, আওয়ামী লীগারদের আশ্রয় এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে অস্বস্তি এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে কোনো যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোয় বাংলাদেশের প্রবেশ নয়াদিল্লিতে ঠিক কী ধরনের কৌশলগত বার্তা পাঠাবে, সেটি একেবারেই উপেক্ষা করার মতো সাধারণ বিষয় নয়।

রয়টার্সের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, পাকিস্তান-অন্তর্ভুক্ত কোনো নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যোগদান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

তবে এখানে ভারসাম্যের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের একমাত্র নিয়ামক হতে পারে না। বাংলাদেশের কোনো বৈধ জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে ভারত সংবেদনশীল না হলে শুধু নয়াদিল্লির মনোভাব বিবেচনা করে ঢাকার প্রতিটি সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে, এমন পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের জন্যও টেকসই নয়। একইভাবে সৌদি আরব, তুরস্ক কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অন্য কোনো রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া সমীচীন হবে না।

বন্ধুত্ব পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের শেষ বিচারে মুখ্য থাকে স্বার্থের ভারসাম্য।

রোহিঙ্গা সম্পর্কিত কূটনৈতিক অবস্থানটিও এই ইস্যুতে সমানতালে প্রাসঙ্গিক। মক্কা চুক্তির সম্ভাব্য তাৎপর্য বিচার করতে গিয়ে রোহিঙ্গা সংকটকে আলাদা করে দেখারও তাই সুযোগ নেই।

মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ বছরের পর বছর আশ্রয় দিয়ে আসছে। এই সংকটের স্থায়ী সমাধান বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি এবং নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রয়োজন বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সমর্থন। এখানে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক ভূমিকা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু সেই সমর্থন একাই যথেষ্ট নয়। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও সমন্বয় ধরে রাখা জরুরি।

রোহিঙ্গা সংকট আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। নিরাপত্তা এখন আর কেবল সীমান্ত ও সামরিক সক্ষমতার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, অভিবাসন, পরিবেশ এবং মানবিক নিরাপত্তাও সমানভাবে জড়িত। সংকটটির অর্থনৈতিক চাপও ক্রমশ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে বাংলাদেশের ওপর এই দায় আরও ভারী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা সহায়তা কমে যাওয়াকে বাংলাদেশের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অতিরিক্ত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

অতএব, বাংলাদেশের কাছে এমন কোনো কূটনৈতিক সম্পর্কই অপ্রাসঙ্গিক নয়, যা এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমর্থনের পরিসর বাড়াতে পারে।

এদিকে, এই সমীকরণে তুরস্কের অবস্থানও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক সামরিক শক্তি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কও কেবল রাজনৈতিক সৌহার্দ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বিষয়টি যতটা সম্ভাবনাময় ঠিক ততটাই জটিল।

এদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবশ্যই ১৯৭১-এর ইতিহাসের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সেই ইতিহাসের জটিলতা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু ইতিহাসের ভারকে স্বীকার করেও বর্তমানের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়া যায়। এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি, তা হলো কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং কোনো সামরিক জোটের বাধ্যবাধকতা গ্রহণ দুইটি এক বিষয় নয়। কাজেই বাংলাদেশের কৌশলগত চিন্তায় এই দুই বিষয়কে পৃথক রেখেই এগোতে হবে।

মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই।

যদি চুক্তির কাঠামো এমন হয় যে একজন সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে অন্য সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং তার ভিত্তিতে যৌথ প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য নিছক কূটনৈতিক সম্পর্কের সীমা ছাড়িয়ে যাবে।

কারণ সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতা এক নয়। তাদের ভৌগোলিক অবস্থান, সম্ভাব্য সংঘাত, সামরিক অগ্রাধিকার এবং কৌশলগত স্বার্থও ভিন্ন।

অন্য কোনো সদস্যের নিরাপত্তা সংকট কি কোনো পর্যায়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হবে? কোনো সংঘাতে বাংলাদেশকে কি সামরিকভাবে যুক্ত হতে হবে? নাকি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের মধ্যেই তার দায় সীমাবদ্ধ থাকবে?

এতসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না জেনে কোনো সামরিক অঙ্গীকার গ্রহণ করা এই মুহূর্তে বিচক্ষণতার পরিচয় হবে না। চুক্তির প্রতিটি ধারা তাই গভীরভাবে পর্যালোচনা করা শুধু প্রয়োজনই নয়, ভবিষ্যত বাঁচার ব্যবস্থাও। ফলে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতার পরিধি কতটুকু, সামরিক সহায়তার ধরন কী, কমান্ড কাঠামো কেমন, কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের দায় কী এবং সেই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ভূমিকা কতটা। এসব স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

মনে রাখতে হবে কূটনীতিতে কখনো কখনো ‘হ্যাঁ’ বলার চেয়ে কোন কোন শর্তে ‘হ্যাঁ’ বলা হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এখানে একটি বড় সতর্কবার্তা দেয়। দেশের রপ্তানি মূলত যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের বাজারনির্ভর। শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। একই সঙ্গে চীন, ভারত ও জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ কোনো একটি ভূরাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যেই বাংলাদেশের স্বার্থ নিহিত। এই বাস্তবতায় কোনো একটি ভূরাজনৈতিক জোটের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা অন্য অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। রয়টার্সও সতর্ক করেছে, আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হতে পারে।

সুতরাং বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি শুধু ‘জোটে যোগ দেওয়া হবে কি না’ এত সরল নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সহযোগিতার সম্ভাবনাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, অথচ তার বিনিময়ে অপ্রয়োজনীয় কোনো সামরিক বা কূটনৈতিক দায় নিজের কাঁধে নিতে না হয়।

এমন পথ বিবেচনায় নিয়েই তারপর পথ হাঁটতে হবে।

এহেন বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথ হতে পারে মক্কা চুক্তিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করা, আবার তাড়াহুড়ো করে পূর্ণ সামরিক অঙ্গীকারেও না যাওয়া।

প্রথমে চুক্তিটির পূর্ণ কাঠামো, সদস্যদের পারস্পরিক বাধ্যবাধকতা, কমান্ড কাঠামো, সামরিক সহায়তার ধরন এবং সম্ভাব্য সংঘাতে বাংলাদেশের দায় সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। এর পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতা, পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি ও নিরাপত্তা, এবং মিয়ানমার প্রশ্নে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সবকিছুকে একটি বৃহত্তর জাতীয় কৌশলের অধীনে আনতে হবে। এরপর ঠিক কোন অংশটিতে আমাদের অবস্থান মর্যাদাপূর্ণ, অংশীদারিত্ব ও কৌশলগত লাভজনক হবে তা চিহ্নিত করে সেই অংশে আগাতে হবে।

মক্কা চুক্তিকে তাই বিচ্ছিন্ন কোনো সামরিক উদ্যোগ হিসেবে না দেখে এটিকে দেখতে হবে বাংলাদেশের বৃহত্তর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির একটি সম্ভাব্য উপাদান হিসেবে। বাংলাদেশের সামনে এখন মূলত এটি একটি ভারসাম্যের পরীক্ষা।

একদিকে মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোর সঙ্গে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ। অন্যদিকে ভারতের মতো বৃহৎ ভৌগোলিক প্রতিবেশীর সঙ্গে বাস্তব ও প্রয়োজনীয় সম্পর্ক বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা।

একদিকে সৌদি শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স, অন্যদিকে পশ্চিমা বাজারনির্ভর তৈরি পোশাক। একপক্ষে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা, অপরপক্ষে কোনো সামরিক সংঘাতে অনিচ্ছাকৃতভাবে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা। একপাশে রোহিঙ্গা সংকটে মুসলিম বিশ্বের সমর্থন, অন্যপাশে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও আসিয়ানসহ বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিসরে সমর্থন ধরে রাখার প্রয়োজন। এতসব পরস্পরসংযুক্ত বাস্তবতাগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করেই বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই হওয়া উচিত নয় বাংলাদেশ কার পক্ষে?

বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, বাংলাদেশের পক্ষে কোন অবস্থানটি অত্যন্ত সহজ ও লাভবান।

মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া যদি বাংলাদেশের নিরাপত্তা, শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, রপ্তানি, বিনিয়োগ ও রোহিঙ্গা কূটনীতিতে বাস্তব সুবিধা এনে দেয়, তাহলে তা বিবেচনার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু এর বিনিময়ে যদি বাংলাদেশকে এমন কোনো সামরিক দায় গ্রহণ করতে হয়, যা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অকারণে জটিল করে, পশ্চিমা বাজার ও অংশীদারদের সঙ্গে আস্থার সংকট তৈরি করে কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত পরিসর সংকুচিত করে, তাহলে সতর্ক হওয়াই হবে অধিকতর বিচক্ষণ পথ।

বাংলাদেশের কূটনীতির অন্যতম বড় শক্তি তার ভারসাম্য। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এই নীতিকে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে আরও পরিণত, বাস্তববাদী ও কৌশলগত করে তোলাই এখন সময়ের দাবি।

মক্কার নতুন সমীকরণ বাংলাদেশের জন্য তাই কেবল একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়া বা না-দেওয়ার প্রশ্ন নয়। এটি একই সঙ্গে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের এক কঠিন পরীক্ষা। আমাদের অর্থনীতি যুদ্ধের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, দাঁড়িয়ে আছে শান্তি, বাণিজ্য, শ্রমবাজার, রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও মানুষের চলাচলের ওপর।

সুতরাং মক্কার সমীকরণে বাংলাদেশের পথ হওয়া উচিত কোনো পক্ষের অনুসরণ নয়, নিজের স্বার্থকে সামনে রেখে সুবিধাজনক ভারসাম্য রক্ষা করার পথ।

লেখক: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও সভ্যতা ডিসিপ্লিনের শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)