সম্পাদকীয়
আহসান কবীর
মানুষের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো তার ভিন্নতা। একেক মানুষের একেক রকমের রূপ। ভিন্ন ভিন্ন তার চাল-চলন, আচার-আচরণ। সব মানুষ যদি এক রকম হতো, তাহলে বৈচিত্র্য বলে কিছু থাকতো না।
কোনো কোনো মানুষের ভিন্নতা অন্যদের চেয়ে প্রকটভাবে দৃশ্যমান হতে পারে। যশোর সদর উপজেলার চাঁদপাড়া গ্রামে আফিয়া নামে একটি শিশু জন্ম নেয়; যে অন্যদের চেয়ে একেবারেই আলাদা। ইউরোপীয়দের মতো তার গায়ের রঙ। মাথার চুল ও ভ্রুও বাঙালিদের মতো নয়।
আফিয়ার জন্মদাত্রী মনিরা একেবারেই গ্রাম্য নারী। জীবনে কখনও তিনি এলাকার বাইরে যাননি, বিদেশ তো দূরের কথা। নিতান্ত দরিদ্র ঘরে বেড়ে ওঠা মনিরার কোনো বিদেশির সঙ্গে আলাপ তো হয়ইনি, দেখাও হয়নি কস্মিনকালে।
আফিয়ার জন্মের পর তার বাবা মোজাফফর হোসেনের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। তার ভাবনায় আসে, নিশ্চয় শিশুটি তার ঔরসজাত নয়। হয়তো কোনো পশ্চিমা ব্যক্তির ঔরসজাত এই শিশু। কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই প্রতিবেশীরা এক বাক্যে মানছেন, মোজাফফরের সন্দেহ অমূলক। যদিও মোজাফফর তা মানতে নারাজ।
মোজাফফর স্ত্রীকে তালাক দিয়ে বিভূঁইয়ে পাড়ি জমিয়েছেন। নির্দোষ গ্রাম্য নারী মনিরা বেঁচে থাকার তাগিদে অবুঝ শিশুসন্তানসহ বাপের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। সেখানে তাকে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে।
সুবর্ণভূমির রিপোর্টাররা এই বিষয়ে কথা বলেছেন চিকিৎসকের সঙ্গে। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, জীনগত কারণে এমনটি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
যতই উন্নয়ন-অগ্রগতির কথা বলি না কেন, বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এখনো অনেক ক্ষেত্রে মধ্যযুগ বা তার আগের মানসিকতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। এই সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ আজও অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতায় পূর্ণ।
কূপমণ্ডূকতা যতই আষ্টেপৃষ্ঠে বেষ্টন করে থাকুক না কেন, সমাজের একটি অগ্রসর অংশও আমাদের পথ দেখাচ্ছে। সেই অগ্রসর অংশকেই দায়িত্ব নিতে হবে পিছিয়ে পড়া সমাজকে টেনে তোলার। জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকারের কর্ণধাররাসহ স্থানীয় বিশিষ্টজনরা এগিয়ে আসুন। হতভাগ্য নারী ও তার নিষ্পাপ সন্তানের পাশে দাঁড়ান। শিশুটিকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দিন।