সম্পাদকীয়
ভারতে বেশ কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়েছে ৫ মে। এর মধ্যে পশ্চিমবাংলা রাজ্যে তিনবারের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে বিপুলভাবে পরাজিত করে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
শুধু বাংলাদেশের লাগোয়া প্রদেশই বলেই নয়, পশ্চিমবাংলার অধিবাসীরা প্রধানত বাঙালি। ফলে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবাংলার মানুষের ভাষা, সংস্কৃতিসহ নানা বিষয়ে মিল আছে। পশ্চিমবাংলার অনেক মানুষের আত্মীয়-স্বজনরা বাংলাদেশে বসবাস করেন। একইভাবে বাংলাদেশের বহু মানুষের আত্মীয়-স্বজনদের বাসও পশ্চিমবাংলায়। বাংলাদেশ থেকে যত মানুষ ভারতে যান, তার অধিকাংশই পশ্চিমবাংলা, বিশেষত এই প্রদেশের বৃহত্তম শহর কলকাতাতেই অবস্থান করেন। বিপরীত পক্ষে ভারত থেকে যত মানুষ বাংলাদেশে আসেন, তার বেশিরভাগই পশ্চিমবাংলার মানুষ।
ফলে পশ্চিমবাংলার রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, জীবনাচার বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলে। আবার বাংলাদেশের অবস্থাও পশ্চিমবাংলার সমাজজীবনে গভীর রেখাপাত করে। ফলে পশ্চিমবাংলায় কোন মতাদর্শের রাজনৈতিক দল ক্ষমতা গ্রহণ করতে চলেছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
এবারের নির্বাচনে জয়ী বিজেপি ভারতের কেন্দ্রীয় শাসন পরিচালনা করছে বেশ কয়েক দফায়। উগ্র হিন্দুত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী এই রাজনৈতিক দলটির মূল উপজীব্য ধর্মের ব্যবহার, যা এই আধুনিক জমানায় একেবারেই মানানসই নয়। কিন্তু শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে থাকা ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে ধর্মাশ্রয়ী দলটি মুসলিমবিদ্বেষ ছড়িয়ে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের হত্যা করে, তাদের উপাসনালয় ধ্বংস করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত প্রতিবেশী পাকিস্তান ও বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা পোক্ত করেছে।
সেই বিজেপি যখন বাংলাদেশলাগোয়া এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে যোগাযোগ বেশি থাকা রাজ্যে ক্ষমতা পেয়েছে, তখন বাংলাদেশের জন্য তা চিন্তার বিষয়ই বটে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হিন্দিবলয়ের উত্তর, মধ্য ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে বিজেপি যেভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়ে, ভিন্ন ধর্মের মানুষের উপাসনালয় ভেঙে বা ঠুনকো অজুহাতে অহিন্দুদের ওপর হামলা চালিয়ে নিজেদের ভোটব্যাংক বাড়িয়েছে, পশ্চিমবাংলায়ও এবার তেমনটি দেখা যেতে পারে। যদি তা হয়, তাহলে সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলিমদের বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। এমননিতেই প্রায় দুই মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে নিয়ে বাংলাদেশ মহাবিপদে আছে।
তাছাড়া প্রতিবেশী ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক হাসিনাপরবর্তী জমানায় যথেষ্ট খারাপ হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানে বিতাড়িত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও ভারত এখনও নিরাপদ আশ্রয়ে রেখেছে। পশ্চিমবাংলায় নির্বাচিত হতে না হতে সেখানকার একজন শীর্ষ বিজেপি নেতা মিডিয়ার সামনে হুঙ্কার ছেড়েছেন যে, শেখ হাসিনা এখনও বাংলাদেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী। বিজেপি এই ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য, তৎপরতা আগামী পাঁচ বছর চালিয়ে যাবে বলে ধরে নেওয়ার যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশকে ভারতপ্রশ্নে আরও কঠিন বাস্তবতা মোকাবেলা করতে হতে পারে। পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, এটা নিশ্চিত যে, বাংলাদেশের মানুষ আর শেখ হাসিনার দাসসুলভ অবস্থান দেখতে চায় না। বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের স্বকীয়তা, সম্মান ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ভারতকে মেনে নিতেই হবে। এই প্রশ্নে বাংলাদেশের মানুষ কোনো ছাড় দেবে না। চব্বিশের মহান গণঅভ্যুত্থানে আমরা জনগণের শক্তি সম্বন্ধে ধারণা পেয়েছি। আশা করি, বিজেপি নেতৃত্ব বিষয়টি মাথায় রাখবেন।