সম্পাদকীয়
মেক্সিকো ও লাতিন আমেরিকার ফসল ড্রাগন ফল যখন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাটিতে মুকুলিত হয়, তখন তার সঙ্গে ফুটে ওঠে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক নতুন অধ্যায়। নতুন ধরনের এই অর্থকরী ফসল চাষাবাদ এখানকার বিপুল সংখ্যক মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করেছে। চাকরি ছাড়াই নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। গড়ে উঠেছে স্বতঃস্ফূর্ত বাণিজ্যিক কাঠামো, এবং বাড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতির আকার।
ঝিনাইদহের মহেশপুরের গৌরিনাথপুর গ্রামে ২০১৬ সালে মাত্র ৩৯ শতক জমি দিয়ে শুরু করা এক চাষি আজ ২২ বিঘায় ড্রাগন চাষ করে বছরে এক কোটি টাকার বেশি দামের ফল বিক্রি করছেন। তাকে অনুসরণ করে বহু চাষি প্রচলিত চাষাবাদের বাইরে এসে ড্রাগন উৎপাদনে নিয়োজিত হয়ে নিজেদের জীবনমান উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছেন।
এই সাফল্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বাজারজাতকরণ ব্যবস্থায় কৃষকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য নয়; নিজ গ্রামের আড়তে নিজের ফল বিক্রি করে কৃষক নগদ অর্থ পাচ্ছেন। সরকারি উদ্যোগে ড্রাগনের বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তারা যে আড়ত চালু করেছেন, তা বাজারকে গতিশীল করেছে। ৮০টি আড়ত, দুশ’র বেশি দোকান- প্রতিদিন প্রায় আড়াই কোটি টাকা লেনদেন দেশের কৃষিপণ্যের বাণিজ্যিকীকরণের নতুন পথ খুলে দিয়েছে।
যা আরও আনন্দের, তা হলো কৃষি বিভাগের তৎপরতা। ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার ঠেকাতে প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তাদের সরাসরি নজরদারি কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থই রক্ষা করছে। ভোক্তা যেমন পাচ্ছেন নিরাপদ ফল, তেমনি কৃষকও পাচ্ছেন ন্যায্য মূল্য। আর এই সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর পাইকারদের উপস্থিতি গ্রামীণ এই বাজারকে আন্তঃজেলা ও আন্তঃআঞ্চলিক ড্রাগন বাণিজ্যের হাবে পরিণত করেছে।
তবে কেবল ফল উৎপাদন ও বিক্রি নয়, এর পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলার বিষয়টিও এখন সময়ের দাবি। ড্রাগনের জুস, জ্যাম বা শুকনো ফল তৈরি করলে কৃষক আরও লাভবান হবেন এবং অপচয় কমবে। এ ছাড়া বাজারকে আরও সুসংহত করতে প্রয়োজন কোল্ডস্টোর, মান পরীক্ষার ল্যাব ও রপ্তানিমুখী উদ্যোগ।
ড্রাগনের রাজ্য বলতে আমরা যাকে দেখছি, তা কেবল একটি ফলের রাজ্য নয়; এটি কৃষকের আত্মবিশ্বাস, প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ এবং নগরায়ণমুখী জীবন-জীবিকার এক মেলবন্ধন। এই রাজ্যের সিংহাসনে বসে আছে পরিশ্রমী কৃষক, আর তাদের পাশে দাঁড়িয়ে কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীরা। সমগ্র বাংলাদেশের কাছে এই গৌরিনাথপুরের সাফল্য একটি বার্তা- সঠিক পরিকল্পনা, স্থানীয় উদ্যোগ এবং সরকারি সহায়তা একসঙ্গে মিললে দেশের যেকোনো প্রান্তেই অর্থনৈতিক বিপ্লব সম্ভব। ড্রাগনের এই রাজ্য যেন শুধু মহেশপুর বা তার আশপাশে সীমাবদ্ধ না থাকে, এটি হোক সারা দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য একটি মডেল।