যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

একক পরিবার, মানুষের একাকিত্ব ও পশুপ্রেম

মো. মিজানুর রহমান

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই,২০২৬, ১২:০০ পিএম
একক পরিবার, মানুষের একাকিত্ব ও পশুপ্রেম

পারিবারিক বন্ধনমুক্ত হয়ে নিকটজনদের থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে মানুষ। আমাদের যাদের নব্বই দশকে জন্ম তারাও গ্রামে যৌথ পরিবারে বসবাসের সুযোগ পেয়েছি। তখন একেকটি পরিবারে দশ-পনের জন থাকতো। আমাদের সময় হতেই মানুষের মধ্যে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে বসবাসের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। শুরুতে এই একক পরিবারে সদস্য সংখ্যা ছয়-সাত থাকলেও। অল্প সময়ের মধ্যে তা চার সদস্যে নেমে আসে। কোনো কোনো পরিবার একটি মাত্র সন্তান নিয়ে অর্থাৎ তিন সদস্যে গঠিত। এই সন্তানদের মধ্যে আবার অনেকেই উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে বা রেমিটেন্সযোদ্ধা হয়ে প্রবাসী হচ্ছে। প্রবাসে সন্তান একা, দেশে শুধু মা-বাবা। মানুষের মধ্যে ক্রমশ একাকিত্ব বেড়ে চলেছে।

টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন মানুষের কাছ থেকে মানুষকে আরও দূরে সরে গেছে। সিম কোম্পানির বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে ‘দূরত্ব যতই হোক, পাশে থাকুন’। মানুষ বিজ্ঞাপনটাকে বিপরীতভাবে আত্মস্থ করেছে, পাশাপাশি থেকেও তারা দূরত্ব মেনে চলছে। স্বামী বিছানায় শুয়ে স্ত্রীকে টেক্সট করছে ‘ডাইনিং এ আসব? খাবার রেডি?’ স্ত্রী টেক্সট করছে, ‘অপেক্ষা করো’। মানুষে মানুষে স্বাভাবিক সরাসরি আলাপও হ্রাস পেয়েছে। মানুষ যেমন মানুষের সাথে কথা কমিয়ে দিয়েছে, তেমনি কথা শোনাও কমিয়েছে। বিত্তবান, মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্নবিত্তের মাঝেও এই প্রবণতা লক্ষণীয়।

আগে প্রতিবেশির খবর রাখতো মানুষ। এখন পাশের ফ্লাটের মানুষ যদি মরে গিয়ে গন্ধ ছুটে যায় ৯৯৯ এ ফোন দিয়ে দায় সারে। এসব পরিবারের বাচ্চারা পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন শিখছে না। বাচ্চাদের মধ্যে পারিবারিক বন্ধন না থাকায় এখনকার বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের আবাসিক হলের/মেসের রুমমেটের খবরই জানে না। অনেক বন্ধু হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করছে। তাদের মানসিক সাপোর্ট হয়ে কোনো বন্ধু এগিয়ে আসছে না। কারণ একক পরিবারতন্ত্র মানুষের শেকড়অব্দি পৌঁছে গেছে এবং মানুষ ‘একলা চল রে’ নীতিতে প্রশিক্ষিত হয়ে উঠেছে।

এখন মানুষে মানুষে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক আর নেই। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে মানুষের সঙ্গী আর মানুষ হচ্ছে না। এখন শহরাঞ্চলের ধনী এবং মধ্যবিত্ত মানুষের সঙ্গী হচ্ছে লাভ বার্ড, বাজরিকা, কোকাটাইল পাখি। একাকিত্ব দূর করতে অনেকে হুতোম পেঁচাও পোষে। আছে পার্সিয়ান, মেইন কুন, সিয়ামিজ, ব্রিটিশ শর্টহেয়ার এবং বেঙ্গল জাতের বিড়াল। আরও আছে জার্মান শেফার্ড, ল্যাব্রাডর রিট্রিভার, সাইবেরিয়ান হাস্কি, গোল্ডেন রিট্রিভার এবং পুডল ইত্যাদি জনপ্রিয় বিদেশি কুকুর। গরিবের এসব দামি প্রাণী না থাকলেও তারা খাঁচায় শালিক বা ময়না/টিয়া পুষছে। দেশি বিড়াল ও কুকুরও পুষছে কেউ কেউ।

শহরাঞ্চলে কুকুর পোষার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে করোনাকালীন বাস্তবতা, পরিবর্তিত জীবনধারা এবং মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন কাজ করছে। পোষা প্রাণী এখন শুধু শখ নয়। মানসিক প্রশান্তি ও একাকিত্ব দূর করার জন্য মানুষ এখন পোষা প্রাণীর প্রতি বেশি মমত্ববোধ দেখাচ্ছে। মানুষের একাকিত্বের সুযোগ নিয়ে পেট এনিম্যাল, তাদের খাদ্য ও চিকিৎসা সরঞ্জামের একটা বিরাট বাজার তৈরি হয়েছে। একাকী জীবনে আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর জায়গাটুকু মানুষ রাখেনি। কাজেই মানুষের মধ্যে পোষা প্রাণীর সাথে সাথে রাস্তার ভবঘুরে কুকুর-বিড়ালের প্রতিও ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। বলা যায় দেশে পোষা প্রাণীপ্রেমে এক বিপ্লব ঘটেছে। সাথে সাথে ভবঘুরে কুকুর-বিড়ালের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। গ্রামে যেখানে এখনও যৌথ পরিবার আছে, আপনজনেরা পাশাপাশি বসবাস করে, পরস্পরের সাথে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক আছে, সেখানে কুকুর-বিড়াল বা পাখি পুষতে তেমন দেখা যায় না।

পাখি হিংস্র নয়। পোষা পাখি আমাদের মাঝে এখন পর্যন্ত কোনো রোগ বিস্তার করেনি। এছাড়া যেহেতু পাখিপ্রেমীরা অভয়ারণ্য তৈরিসহ পাখির মঙ্গলার্থে নানান কাজে এগিয়ে এসেছে, সেহেতু যারা শখে ঘরে পাখি পুষছেন, তাদের বিষয়ে অধিক আলোচনার প্রয়োজন নেই। যারা বিদেশি জাতের কুকুর পুষছে তারা তাদের পোষা প্রাণীকে ভালো খাবার খাওয়াচ্ছে, নিয়মিত ভ্যাক্সিনেশন করছে। কিন্তু ভবঘুরে রাস্তার এই কুকুর-বিড়ালগুলোর ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন।

যেখানে দেশের একটি বড় অংশ নিয়মিত মাছ-মাংস খেতে পায় না, সেখানে পোষা কুকুর-বিড়ালের জন্য বাজার থেকে মাছ নিয়ে যাচ্ছে অনেকেই। কখনো কি তারা খেয়াল করেছে যে, যারা মাছ কাটে তাদের কাছ থেকে গরিবেরা মাছের উচ্ছিষ্ট অংশ কিনে নিয়ে যাচ্ছে তার পরিবারের জন্য। গরিবের ভাবনা ধনী কেন ভাববে? এই জন্য ভাববে যে, এই ধনীরা ইদানীং রাস্তার ভবঘুরে কুকুর-বিড়ালকে ভালোবাসতে শিখেছে। অবলা প্রাণীর প্রতি তাদের মায়া জন্মেছে। ওই ভবঘুরে কুকুর-বিড়ালগুলো কোথায় থাকে? এই গরিবের ঘরের আশপাশে। এই গরিবেরাই খেয়ে, না-খেয়ে বেঁচে আছে। তারা এই কুকুর-বিড়ালকে কী খাওয়াবে? আমরা প্রায়ই বলি, কুকুর-বিড়াল হাড়, কাঁটা আর উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকে। আচ্ছা, রাস্তার এইসব কুকুর-বিড়ালকে কে কবে সেধে মাছ-মাংস খাইয়েছে? গরিব ঘর হতে যে হাড়-কাটা বের হয় তাতে কুকুর বিড়ালের জন্য অবশিষ্ট কিছু থাকে? আর ধনীর খাবারের উচ্ছিষ্ট, যাতে মাছ-মাংশের অপচয় থাকে সে ময়লা পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি এসে নিয়ে নির্দিষ্ট ভাগাড়ে ফেলে আসে। তাহলে এই রাস্তার কুকুর-বিড়ালের খাবার ব্যবস্থা কী হবে?

এই কুকুর-বিড়াল খাদ্যের অভাবে, চিকিৎসার অভাবে ক্ষ্যাপাটে হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। এদেরকে নিয়মিত ভ্যাক্সিনেশন না করানোয় জলাতঙ্ক রোগ ছড়িয়ে পড়ে। যেহেতু এদের গরিবের সাথে বসবাস, এরা এই গরিব অসচেতন মানুষের এবং তাদের শিশু সন্তানের ওপর আক্রমণ করে। তাদের জলাতঙ্ক হয় এবং কখনও কখনও করুণ মৃত্যু হয়। শিশু সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে যখন কেউ আইন ভেঙে কুকুর-বিড়াল নিধন করতে যায়, তখন এই পশুপ্রেমীরা নিধনকারীর বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করে। ধনীরা তার একাকিত্ব ঘোচাতে যে পশুপ্রেম দেখায়, অনেকেই তাদের বাচ্চা ও নিজের নিরাপত্তার জন্য সেই পশুর নিধন চায়।

টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রে প্রায়ই কুকুরের কামড়ে মানুষের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যায়। সরকারি হাসপাতালে কুকুর-বিড়ালে কামড়ানো/আঁচড়ানো রোগীর লাইন দেখা যায়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে, কুকুর-বিড়ালের প্রতি সাধারণ মানুষের আক্রমণাত্মক মনোভাবের বিরুদ্ধে পশুপ্রেমীদের সোচ্চার হতে দেখা গেলেও কুকুর-বিড়ালের আক্রমণের শিকার মানুষদের নিয়ে পশুপ্রেমীদের তেমন আওয়াজ তুলতে দেখা যায় না।

আসুন কুকুর পেষার বিষয়ে ইসলাম ধর্মের হাদিস এবং বাংলাদেশের আইন সম্পর্কে কিছু জানতে চেষ্টা করি।

১. রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শিকারি, গবাদি পশু রক্ষাকারী অথবা শস্যক্ষেত পাহারা দেওয়া কুকুর ব্যতীত অন্য কোনো কুকুর লালন-পালন করে, তার আমল থেকে প্রতিদিন এক কিরাত পরিমাণ সওয়াব কমে যায়।’ বুখাখি: ৫৪৮২; মুসলিম: ১৫৭৫

২. ‘যে ঘরে কুকুর থাকে, সে ঘরে রহমতের ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না।’ বুখারি: ৫৫২৫

৩. ‘যদি কোনো কুকুর তোমাদের পাত্রে মুখ দেয়, তবে তা সাতবার ধৌত করো এবং প্রথমবার মাটি দিয়ে ধৌত করো।’ মুসলিম: ২৭৯

আবার নিজ মহল্লায় যদি কোনো কুকুরের জন্ম হয় তার জন্য হাদিসে বলা হয়েছে, ‘একবার একটি কুকুর পিপাসার্ত অবস্থায় কোনো এক কূপের পাশে চক্কর দিচ্ছিল। ইত্যবসরে বনি ইসরাইলের এক দেহপসারিণী তাকে দেখলো। ফলে সে নিজের চামড়ার মোজা খুলে তার জন্যে পানি তুলল ও তাকে পান করালো। ফলে এর বিনিময়ে তাকে ক্ষমা করা হলো।’ বুখারি: ৩৪৬৭

কুকুর প্রতিপালনের বিষয়ে বাংলাদেশের আইন

১. প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৯: এই আইন অনুযায়ী প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা, অকারণে আঘাত, বিষ প্রয়োগে হত্যা দণ্ডণীয় অপরাধ।

১৮৬০: দণ্ডবিধির ৪২৯ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো গবাদি পশু বা মূল্যবান প্রাণী (কুকর বা বিড়ালসহ) হত্যা বা বিকলাঙ্গ করা হয়, তবে অপরাধীর সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

২. হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, কোনো কর্তৃপক্ষ বা ব্যক্তি বেওয়ারিশ কুকুর বা বিড়াল নিধন করতে পারবে না, বরং কুকর নিয়ন্ত্রণ (টিকা ও বন্ধ্যাত্বকরণ) পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

মানুষের একাকিত্ব, একাকিত্বের সঙ্গী কুকুর, কুকুর পোষার বিষয়ে হাদিস ও বাংলাদেশের প্রাণী আইন নিয়ে এই দীর্ঘ আলোচনা অহেতুক হবে যদি আলোচ্য বিষয়াদিতে আমরা সচেতন না হই। আসুন আমরা সচেতন হই:

১. পারিবারিক বন্ধন শক্ত করতে হবে। নিজ স্বজনদের সাথে সময় কাটাতে হবে;

২. মানুষের পাশে থেকে মানুষকে ভালোবাসতে হবে। মানুষের চোখে তৃপ্তির সুখ খুজতে হবে। প্রাণী প্রকৃতিতেই সুন্দর, তাকে ধরে-বেঁধে সুখ দেওয়ার চেষ্টায় কৃতিত্ব নেই;

৩. সন্তানকে পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা দিতে হবে। সন্তানকে তার আপনজন, আত্মীয়-স্বজনের কাছে নিয়ে যেতে হবে। দেখাতে হবে যে সে একা নয়;

৪. বাচ্চার সঙ্গী হিসেবে কুকুর-বিড়াল নয় তার আপনজনকে কাছে রাখতে হবে;

৫. মুসলিম হলে অপ্রয়োজনে কুকুর পালন হতে বিরত থাকতে হবে;

৬. যেহেতু কুকুরের খাদ্য সংকট, কুকুরের মাংস আমাদের দেশে অখাদ্য এবং কুকুরের মাংস বিদেশে রপ্তানিও করা হয় না, সেহেতু কুকুরের বিস্তার নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখতে সচেতন হতে হবে;

৭. যেসব এলাকায় কুকুর-বিড়ালের বিস্তার বেশি, সেসব এলাকার সিটি কর্পোরেশন অথবা পৌরসভাকে অবহিত করে ভ্যাক্সিনেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে বন্ধ্যাত্বকরণ টিকা দিতে হবে;

৮. যারা কুকুর পালছে তাদেরকেই কুকুরবিষয়ক সচেতনতা তৈরি করতে হবে, যাতে তাদের দেখাদেখি গরিবেরা এই রাস্তার কুকুর ঘরে পুষতে চেষ্টা না করে;

৯. শুধু কুকুরের জন্য মানববন্ধন না করে যাদেরকে কুকুরে কামড়াচ্ছে/আঁচড়াচ্ছে তাদের হয়েও আওয়াজ তুলতে হবে। আগে মানবপ্রেম, পরে পশুপ্রেম দেখাতে হবে;

১০. কুকুর-বিড়ালের বিস্তাররোধ করতে গিয়ে তাদের প্রতি জুলুম/নির্যাতন করা যাবে না। অকারণে তাদের হত্যা করা দণ্ডীয় অপরাধ;

১১. আপনার সহমর্মিতায় আপনজন, প্রতিবেশীর অগ্রাধিকার বেশি। এটা মানতে হবে। এখান থেকেই মানবিকতার শুরু।

গোটা চারেক হলদে-কালো কুকুর ঘিরে থাকায় যেসব অসহায় মানুষ আমাদের পাশে আসতে পারলো না, আসুন আমরা তাদের খবর রাখি। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে থাকি। সুস্থ ও ভালো থাকি।

লেখক: যুগ্মপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক, খুলনা

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন