সম্পাদকীয়
সংস্কৃতি হলো একটি জাতির প্রাণ। জাতির অস্তিত্ব, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা লুকিয়ে থাকে তার সংস্কৃতিচর্চায়। সেই চর্চাকে উৎসাহিত করতে এবং শিল্পী-সাহিত্যিকদের জীবনমান উন্নত করতে সরকার প্রতিবছর জেলা পর্যায়ে যে অনুদান বিতরণ করে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয় কাজ। কিন্তু গত অর্থবছরের অনুদান বিতরণ ঘিরে যশোরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, নামসর্বস্ব বা কার্যক্রমহীন সংগঠনও সরকারি অনুদানের আওতায় এসেছে; যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রায় সাড়ে ২৯ লাখ টাকার এই অনুদান পেয়েছেন ৫৮ জন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও ৪২টি সংগঠন। কিন্তু অভিযোগ, এই ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর একটি বড় অংশ নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন; অনেক সংগঠন তো কেবল কাগজে-কলমেই সক্রিয়। প্রকৃত শিল্পী, যারা রাত-দিন চর্চা করে চলেছেন, তাদের বাদ দিয়ে কীভাবে অনুদান পাচ্ছেন নিষ্ক্রিয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান?- এ প্রশ্ন অত্যন্ত যৌক্তিক।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অভিযোগ, নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাই না করেই বছরের পর বছর একই ব্যক্তি ও সংগঠনের নাম সুপারিশের তালিকায় স্থান পাচ্ছে। জেলা শিল্পকলা একাডেমি বলছে, চূড়ান্ত তালিকা আসে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে, তারা শুধু বিতরণের কাজ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মন্ত্রণালয় তো নিজে থেকে এসে তালিকা তৈরি করে না। স্থানীয়ভাবে গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই সেই তালিকা অনুমোদিত হয়। এখানে অন্যের ঘাড়ে দায় চাপানোর সুযোগ নেই। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দায়িত্ব নিঃসন্দেহে স্থানীয় প্রশাসনের।
আমরা যখন দেখি, অনুদানপ্রাপ্ত ৪২টি সংগঠনের মধ্যে অন্তত ১৭টির বছরে কোনো কার্যক্রম নেই, আরও ছয়টির আছে মাত্র একটি করে অনুষ্ঠান; অথচ ৪১টি সংগঠন অনুদান পেয়েছে, তখন এটা স্পষ্ট হয় যে, প্রক্রিয়াটির কোথাও না কোথাও গলদ রয়েছে। হয় সুপারিশ প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো হচ্ছে, নয়তো যাচাই কমিটি যথাযথভাবে কাজ করছে না। যার ফলে প্রকৃত সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠন বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই বিতর্ক থেকে বেরিয়ে আসার জন্য অনুদানের আবেদন যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি আরও কঠোর ও উন্মুক্ত করা দরকার। আবেদনকারীর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রামাণ্য তথ্য, গত তিন বছরের ধারাবাহিকতা, এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে তার সক্রিয়তার সনদ বাধ্যতামূলক করতে হবে। জেলা পর্যায়ে সুপারিশ কমিটির গঠন এমন হতে হবে, যাতে পক্ষপাতিত্বের কোনো সুযোগ না থাকে। কমিটিতে স্বনামধন্য ও সক্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের অন্তর্ভুক্ত করে স্বচ্ছতা আনা জরুরি। এছাড়া অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও সংগঠনকে পরবর্তী বছরে তাদের সম্ভাব্য কর্মকাণ্ডের একটি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে; যা পর্যালোচনা না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সক্রিয়তা অনুধাবন করা যাবে।
শুধু চেক বিতরণেই প্রশাসনের দায়িত্ব শেষ নয়; নিশ্চিত করতে হবে টাকাটা সঠিক জায়গায় পৌঁছেছে। সংস্কৃতিচর্চা যেমন ধারাবাহিক, অনুদান বিতরণের প্রক্রিয়াও তেমন ধারাবাহিকভাবে যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। পক্ষপাতমূলক মনোনয়ন যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা প্রকৃত শিল্পীদের মনোবল ভাঙবে এবং সংস্কৃতিচর্চাকে নিরুৎসাহিত করবে।
এসব বিষয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক হতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো অনুদান ব্যবস্থাই সফল হতে পারে না। সাংস্কৃতিক খাতে সহযোগিতা হোক প্রকৃত শিল্পীদের কর্মকাণ্ড বাড়াতে।