সম্পাদকীয়
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের টেংরাখালীতে প্রায় ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি পাকা সেতু স্থানীয়দের কাছে উপহাসের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেতুটি যেন খালের মাঝখানে গড়ে ওঠা একটি দ্বীপ; যার দুই পাড়ে নেই কোনো সংযোগ, নেই কোনো পথ। নির্মাণ শেষ হয়েছে প্রায় এক মাস আগে, কিন্তু অ্যাপ্রোচ রোড বা সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতুটি ব্যবহারের অযোগ্য। আর এই অযৌক্তিকতার কারণেই টেংরাখালীসহ পার্শ্ববর্তী পাঁচ গ্রামের হাজারো মানুষ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের সাঁকো পেরিয়ে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এটি নিছক প্রকৌশলগত ভুল নয়; এটি পরিকল্পনা ও দায়িত্ববোধের এক চরম ব্যর্থতা। যে প্রকল্পে জনগণের করের টাকা বিনিয়োগ করা হয়, সেখানে সেতু নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে সংযোগ সড়কের কাজও সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আরিফ এন্টারপ্রাইজ’ নির্মাণকাজ শেষে নির্বিঘ্নে চলে গেছে, আর প্রশাসন তাকিয়ে আছে বৃষ্টি থামার দিকে। যেন বর্ষাকাল শুধু এই প্রকল্পের জন্যই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে! অথচ বাস্তবে তারা যদি মৌসুমি প্রতিকূলতা জানতেন, তবে কাজের সময়সূচি ও পরিকল্পনা সেভাবে করতে হতো।
ঠিকাদারের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ আছে। সংযোগ সড়কের জন্য নির্ধারিত স্থান থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি কেটে বিক্রি করেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এর ফলে শুধু সড়ক নির্মাণের মাটির সংকটই তৈরি হয়নি, বরং খাদের সৃষ্টি হয়ে আশপাশের বসতবাড়ি ধসের ঝুঁকিতে পড়েছে। এটা যদি সত্যি হয়, তবে তা শুধু অনিয়ম নয়, এটি প্রতারণা ও জনস্বার্থে আঘাত। প্রশাসন যদি এই অভিযোগকে হালকাভাবে দেখে, তাহলে দুর্নীতির এই চক্র কখনোই ভাঙবে না।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) বলছেন, তারা বিষয়টি জানেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু ‘দ্রুত’ বলতে কী বোঝায়, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। শিক্ষার্থীরা যখন ভাঙা সাঁকো দিয়ে স্কুলে যায়, বৃদ্ধ-রোগীরা যখন চিকিৎসার জন্য ঝুঁকি নেয়, তখন প্রশাসনের ‘অপেক্ষা’ কতটা মূল্যবান? বৃষ্টি কমলে কাজ শুরু হবে- এই বক্তব্য জনদুর্ভোগ বাড়াবে বই কমাবে না। বৃষ্টি থামলে যে নতুন সমস্যা আসবে না, তার কী নিশ্চয়তা আছে?
এখন আর শুধু সংযোগ সড়ক নির্মাণ করলেই দায় মেটে না। মাটি কেটে বিক্রির ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। সেতু নির্মাণে অর্থ বরাদ্দের সময় যেমন হিসাব-নিকাশ ছিল, সংযোগ সড়ক ও পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়টিও তেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
প্রশাসনকে এখনই সক্রিয় হতে হবে। কাজ বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে এমন অর্ধনির্মিত পরিকল্পনা উন্নয়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। টেংরাখালীর সেতু যদি জনগণের চলাচলের জন্য কাজে লাগাতে হয়, তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্তদের ঘুম ভাঙা জরুরি।
মানুষের করের টাকায় নির্মিত প্রতিটি প্রকল্প যেন জনগণের কল্যাণসাধনের উপযোগী হয়- এটাই প্রত্যাশা। দ্রুত সেতুর দুই পাড়ে সংযোগ সড়ক তৈরির উদ্যোগ নিন আর অনিয়মকারীদের শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা করুন।