সম্পাদকীয়
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার খবরটি শুধু একটি পরাজয়ের সংবাদ নয়; এটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজেডি। চলতি বিশ্বকাপে নরওয়ের কাছে হারের মধ্য দিয়ে যে দলটি বিদায় নিল, তারা যেন নিজের ঐতিহ্যের কথা ভুলে গিয়েছিল।
ব্রাজিলবিহীন বিশ্বকাপ কল্পনা করাও কঠিন। ব্রাজিলই একমাত্র দল, যারা প্রতিটি বিশ্বকাপে প্রতিনিধিত্ব করার দুর্লভ কৃতিত্বের অধিকারী। এছাড়া সবচেয়ে বেশি পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নশিপ তো রয়েছেই। অথচ এই অসাধারণ রেকর্ডের অধিকারী দলটিকেই এবার অকালে বিদায় নিতে হলো। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এ এক হতাশাময় শূন্যতা।
ব্রাজিলের এই ব্যর্থতার জন্য অনেকে কোচ আনচেলত্তির একগুঁয়েমি মনোভাবকে দায়ী করছেন। প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে কীভাবে ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা’কে প্রাধান্য দেওয়া যায়? দলের প্রধান তারকাদের সাইডলাইনে বসিয়ে রেখে একাদশ সাজানো কি কোনো দায়িত্বশীল কোচের কাজ? ফলাফল তো সবাই দেখতেই পেয়েছেন। ব্রাজিলের আক্রমণভাগ যেন নিজেদের চেনা ছন্দই ভুলে গিয়েছিল। খেলোয়াড়দের সামর্থ্য থাকলেও কৌশলগত বিভ্রাটে ডুবলো পুরো দল। এলোমেলো ফুটবল খেলে দর্শকদের বিরক্তির উদ্রেক করে করুণভাবে বিদায় নিতে হয় তাদের।
একই দিন ম্যাচশেষে এলো নেইমারের বিদায়ের ঘোষণা। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে চোখের জলে বিদায় নেওয়া এই লিজেন্ডকে দেখে সমর্থকদের কান্নাও বাঁধ ভেঙেছিল। প্রতিভাবান এই ফুটবলারকে এবারের বিশ্বকাপে কতটুকু কাজে লাগিয়েছে ব্রাজিল? নাকি তাকে নিদারুণ অবহেলার শিকার হতে হয়েছে? বিশ্বকাপজুড়ে সাকুল্যে ৩০/৪০ মিনিট খেলানো কি নেইমারের প্রাপ্য? দীর্ঘ চোট কাটিয়ে পুরোপুরি ফিট হলেও তাকে নিয়মিত একাদশে না রাখার সিদ্ধান্ত যেন এক অঘোষিত অবিচার। নেইমারের পারফরম্যান্সে হয়তো এবার খানিকটা খামতি ছিল। কিন্তু তার অসাধারণ নেতৃত্বগুণও তো ব্যবহার করতে পারলো না ব্রাজিল। তাকে প্রথম একাদশে না রেখে ব্রাজিল শুধু তার অন্যতম সেরা অস্ত্রটিকেই হারায়নি, দলকেও নেতৃত্বশূন্য করা হয়েছে। সমর্থকদের ধারণা, তাকে ‘বঞ্চিত’ করা হয়েছে। এই ধারণার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করা কঠিন।
প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য দলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে আর্জেন্টিনা তার সেরা অস্ত্র মেসিকে কীভাবে কাজে লাগাচ্ছে। এখন পর্যন্ত দলটি খেলছে মূলত মেসিকে কেন্দ্র করে। পর্তুগাল তাদের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় রোনালদোকে ৪১ বছর বয়সেও মাঠে রেখে তার প্রতি আস্থার যেমন প্রকাশ ঘটিয়েছে, তেমনি অভিজ্ঞ এই ফরোয়ার্ডকে যোগ্য মর্যাদাও দিয়েছে।
এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিদায় শুধু একটা দলের পতন নয়; এটি বিশ্বকাপের জৌলুসও কমিয়ে দিয়েছে। কারণ ব্রাজিলের ফুটবল মানেই উৎসব, ড্রিবলিং, গোলের বন্যা এবং অপ্রতিরোধ্য আক্রমণ, যা থেকে বঞ্চিত হবেন কোটি কোটি দর্শক। যে দেশ ফুটবলকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে, সেই দেশের এমন করুণ বিদায় ভক্তদের মনে গভীর দাগ কেটে থাকবে বহুদিন।