সম্পাদকীয়
রিপন অটোস-এর অনন্য সাধারণ উদ্যোগ
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা যখন সারাবিশ্বকে গ্রাস করে, তখন বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়; যশোরের মতো মাঝারি শহরেও সেই উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ জেগে থাকে রাতভর, প্রিয় দলের প্রতিটি গোল, প্রতিটি সেভ নিয়ে আশায় বুক বাঁধে। আর এই উত্তেজনার মাঝে এক অব্যক্ত আশা বাস করে হৃদয়ে- একদিন হয়তো বাংলাদেশও পা রাখবে বিশ্বকাপের মহামঞ্চে।
কিন্তু সেই আশা বাস্তবে রূপ নেয় না। ফুটবলে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকার কারণ অনেক। তার মধ্যে অন্যতম ও মৌলিক হলো, আমাদের শহরগুলোতে খেলার মাঠ কার্যত বিলুপ্ত। জনসংখ্যার চাপে মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করতে গিয়ে খেয়ে ফেলেছে খোলা প্রান্তর। যেখানে একসময় শিশুরা বিকালে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলতো, সেখানে এখন ইট-পাথরের অট্টালিকা। ফলে আমাদের শিশুরা খেলাধুলা ছাড়াই বড় হচ্ছে। এখন তাদের অবসর সময়জুড়ে থাকে মোবাইলের পর্দায়, ভার্চুয়াল জগতে; যার ফলে থমকে যাচ্ছে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ।
এই বাস্তবতায় যশোরের আরএন রোড ক্রীড়াচক্রের ছোট্ট মাঠটিতে যেন নতুন প্রভাতের সূচনা হয়েছে। বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্ব শুরু হতেই ‘রিপন অটোস’ নামের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সেখানে আয়োজন করেছে ‘জুনিয়র বিশ্বকাপ’- যেখানে অংশ নিচ্ছে শহরের শত শত ক্ষুদে ফুটবলার। সাত থেকে দশ বছর বয়সী শিশুরা কোচের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত অনুশীলন করছে; আগামী ১১ জুলাই মাঠে গড়াবে আসল লড়াই। অভিভাবকদের ভিড়, শিশুদের উচ্ছ্বাসের এই দৃশ্য যেন শহরকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে এক অন্য সময়ে।
শুধু আয়োজনই নয়, রিপন অটোস জার্সি থেকে কোচ পর্যন্ত এবং আনুষঙ্গিক সব খরচ বহন করছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে অধিকাংশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান লাভ-লোকসানের কঠিন হিসাবেই আবদ্ধ এবং সামাজিক কাজে অর্থব্যয়ে অনাগ্রহী, সেখানে এই উদ্যোগ সত্যিই বিরল ও প্রশংসার দাবিদার। বুর্জোয়া সংস্কৃতির বিকাশের অভাবে এখানে শেকড় গাড়তে পারেনি বলেই হয়তো অনেক প্রতিষ্ঠান সমাজকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবে না। এমন বাস্তবতার মধ্যেও রিপন অটোস তার ব্যতিক্রমী অবস্থান তৈরি করেছে।
শুধু এই টুর্নামেন্টই নয়, আরএন রোড ক্রীড়াচক্রও মূলত তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় চলে। তাদের অর্থায়নে প্রান্তিক শত নারী ও শিক্ষার্থী পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে, জীবিকার পথ পাচ্ছে। এটি কোনো দিবাস্বপ্ন নয়; এটি এক সামাজিক দায়বদ্ধতার বাস্তব নজির।
শুধু সরকার বা ক্রীড়া সংস্থার ওপর ভরসা করা আমাদের রেওয়াজ হয়ে গেছে। কিন্তু সক্ষম ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানেরও যে দায় আছে, তা তারা যেমন ভুলে যান, নাগরিকদের মধ্যেও এনিয়ে কোনো তাপ-উত্তাপ নেই।
শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিনিয়োগ মানে দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে অংশ নেওয়া। সামর্থবান প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিজ উদ্যোগে খেলার মাঠ তৈরি বা ক্রীড়া আসর বসাতে উদ্যোগী হয়, তাহলে দ্রুতই আমাদের ক্রীড়ার মানোন্নয়ন সম্ভব।
সুতরাং, এখনই হাত বাড়ানোর সময়। এগিয়ে আসুন। খেলার মাঠ জমজমাট করে ফিরিয়ে আনুন শিশুর হাসি, স্বপ্ন আর সম্ভাবনা।