সম্পাদকীয়
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সাত দিনব্যাপী দাফন আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। লাখ লাখ শোকাহত মানুষের অংশগ্রহণে এই আয়োজন কেবল একটি ব্যক্তির বিদায়বেলাই নয়; বরং এটি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং নতুন এক রাজনৈতিক-আধ্যাত্মিক যাত্রার সূচনা।
গত মার্চে দাফন হওয়ার কথা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এই অনুষ্ঠান পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ৮৬ বছর বয়সী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যৌথ আগ্রাসনে নিহত হন; যা ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক মর্মান্তিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তার মৃত্যু এবং এরপরের প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সমীকরণও পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিপ্লবী নেতা আলী খোমেনির আদর্শিক উত্তরসূরি হলেও নিজের দায়িত্বকালে ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামোকে সুসংহত করেছেন। তার নেতৃত্বে ইরান আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয় এবং ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ নামে একটি প্রভাবশালী জোট গড়ে তোলে। তাই তার বিদায় কেবল ইরানের জন্য নয়, পুরো ইসলামি বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্যই একটি মাইলফলক।
এই শেষকৃত্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এটি হবে তার পুত্র মোজতবা খামেনির অধীনে প্রথম বড় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। যদিও তিনিও আগ্রাসনের প্রথম দিনের হামলায় আহত হয়েছেন এবং দীর্ঘদিন জনসমক্ষে আসেননি। এই অনুষ্ঠান তার নেতৃত্বের প্রথম পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মোজতবা খামেনি কীভাবে এই শোকাবহ পরিস্থিতি সামাল দেন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করেন, তা আগামী দিনে ইরান তথা পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।
সাত দিনব্যাপী এই আনুষ্ঠানিকতার সময়সূচি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন, এরপর কোম শহরে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যেখানে খামেনি নিজে পড়াশোনা করেছেন, এবং শেষ পর্যায়ে ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় শোকযাত্রা। নাজাফে ইমাম আলীর মাজার এবং কারবালার ইমাম হুসাইনের মাজার শিয়া মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। এই দুই শহরে খামেনির মরদেহ নিয়ে শোকযাত্রা ইরান-ইরাকের গভীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে সামনে এনেছে।
আগামী ৯ জুলাই মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে খামেনির দাফন হবে। মাশহাদ খামেনির জন্মস্থান। সেখানে তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। ইমাম রেজার মাজারের পাশে সমাহিত হওয়া শিয়াদের জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয়। এই স্থানটি খামেনির ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এই দাফন আনুষ্ঠানিকতা তার জীবনের পরিপূর্ণ উপসংহার।
তবে, এই বিদায়ের মধ্যেই কিছু কঠিন প্রশ্ন রয়ে গেছে। ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, আঞ্চলিক প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত- এই সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার মুখে। মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে ফিরবেন কীভাবে? তিনি কি তার পিতার মতো জনপ্রিয় ও ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব দিতে পারবেন? আর ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে দেশটি কীভাবে এগিয়ে যাবে?
খামেনির দাফন শুধু একটি জানাজার আয়োজন নয়; এটি একটি যুগের অবসান এবং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ইরানের জনগণ আজ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাস্তায় নামছে, কিন্তু আগামী দিনগুলোতে তাদের সম্মুখীন হতে হবে বাস্তবতার কঠিন চ্যালেঞ্জের। খামেনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যেমন ‘প্রতিরোধ’ ও ‘স্বনির্ভরতা’-র কথা বলেছেন, এখন সেই পথ ধরেই ইরানকে তার উত্তরসূরিদের এগিয়ে যেতে হবে।
ইরানের জন্য এই সময়টি একটি আদর্শ ও জাতির আত্মপর্যালোচনার সময়। মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধার পাশাপাশি ইরানের জনগণ আজ নতুন এক ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। এমন একটি ভবিষ্যৎ, যা খামেনির আদর্শের আলোকে নির্মিত হবে, নাকি তার অনুপস্থিতিতে নতুন কোনো পথ বেছে নেবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায়বেলায় তার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।