সম্পাদকীয়
যশোর শহরের বর্তমান ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার চিত্রটি আমাদের সামনে এক করুণ বাস্তবতা তুলে ধরে। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও কেন প্রতি বছর বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতার একই চিত্র দেখতে হয়- এই পরিস্থিতি সেই প্রশ্নটিই যেন নতুন করে সামনে আনে। সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি যশোর পৌরসভার ড্রেনেজ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা ও পরিকল্পনার ঘাটতির আয়না হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিকল্পনা ও অবকাঠামোর দুর্বলতাই এ সমস্যার মূল। পৌরসভার মোট ড্রেনের অর্ধেকেরও বেশি (১২৮.৪৯ কিলোমিটার) এখনও কাঁচা, যা বর্ষার পানির চাপ সামাল দিতে অক্ষম। নতুন ড্রেন নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হচ্ছে প্রায় তিন কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নেও সময়গত অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তবে শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ দিয়েই সমস্যার সমাধান হবে না, যদি পুরনো ড্রেনগুলোর সঙ্গে সঠিক সংযোগ ও খাল পুনরুদ্ধারের সমন্বিত উদ্যোগ না থাকে। ড্রেনের গোড়ার সমস্যা আবর্জনা জমা। এই আবর্জনা অপসারণ আসলে প্রতিদিনের কাজ। এই কাজে অসমর্থ হলে নতুন অবকাঠামোও অকার্যকর হতে বাধ্য।
রক্ষণাবেক্ষণ ও স্বচ্ছতার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। চলতি অর্থবছরে ড্রেন পরিষ্কারে দুই কোটি ২৬ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও বছরের অর্ধেক পেরোতেই তার ৮৩ শতাংশ খরচ হয়ে গেছে। অথচ প্রতিদিন মাত্র ৮২-৯০ জন শ্রমিক কাজ করছেন, যাদের মাধ্যমে দুই দিনে শ্রমিক খাতে ব্যয় হয় ৮২ হাজার টাকা। এই খরচের বিপরীতে ড্রেন পরিষ্কারের যে গুণগত মান, তা কি যথাযথ? উত্তর দিতে গিয়ে নাগরিকদের অভিযোগ, ড্রেনের তলদেশ আবর্জনায় ভরাট, প্লাস্টিক-পলিথিনে জমাট বাঁধা। অর্থাৎ, কোটি টাকা খরচ হলেও তার প্রভাব খুবই সামান্য।
নাগরিক সচেতনতার অভাব ও প্রশাসনের দায়বদ্ধতার দিকটিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পৌর কর্তৃপক্ষ যেমন বলছেন, ড্রেনে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা বন্ধ না হলে কোনো উন্নয়নই কাক্সিক্ষত ফল দেবে না। এটি সত্যি, কিন্তু নাগরিকদের সচেতন করতে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কতটুকু? নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সমন্বয়কারী মাসুদুজ্জামান মিঠু যেমনটি বলেছেন, সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান ও খাল পুনরুদ্ধার ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পৌরসভার তৎপরতা কি শুধু বর্ষার আগে শ্রমিক নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ? নাকি ড্রেন পরিষ্কারের কার্যকারিতা মনিটরিং ও জনসম্পৃক্ততার মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগও রয়েছে, তা যাচাই করা দরকার।
বছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা শুধু শ্রমিক মজুরিতে ব্যয় হলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে নাগরিকদের মনে প্রশ্ন আছে। অধিকাংশ কাঁচা ড্রেনে শ্রমিকদের কাজ খুবই সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রয়োজনে যন্ত্রপাতি দিয়ে ড্রেন পরিষ্কারের বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যাতে দ্রুত ও কার্যকর নিষ্কাশন সম্ভব হয়। পাশাপাশি, সাত নম্বর ওয়ার্ডের মতো জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় বেশি শ্রমিক দেওয়া হলেও পানি নিষ্কাশন নিয়ে পুরনো ড্রেনের সমস্যা অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
আসলে যশোরের ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা এক চক্রাকার ব্যর্থতার প্রতীক। প্রতিবছর বৃষ্টির আগে সচেতনতা, বৃষ্টিতে দুর্ভোগ, বৃষ্টি শেষে প্রতিশ্রুতি- এই ধারা বদলাতে হবে। সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেন পরিষ্কারের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং নাগরিকদের সম্পৃক্ততাই পারে এ দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান দিতে। শুধু পয়সা খরচ করলেই হবে না, প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন ও দায়িত্বশীল নাগরিক। তবেই বর্ষায় যশোরের নাগরিকরা স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারবেন, জলাবদ্ধতামুক্ত শহরের স্বপ্ন সত্যি হবে।