যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

এমপির স্বজনপোষণ, নৈতিক দায়বদ্ধতা ও জনগণের প্রতিক্রিয়া

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩০ জুন,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
এমপির স্বজনপোষণ, নৈতিক দায়বদ্ধতা ও জনগণের প্রতিক্রিয়া

নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদান তালিকায় নিজ মেয়ের নাম দুবার (২০ হাজার টাকা) এবং পরিবার-পরিজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার দায়-দায়িত্ব এমপি তার ব্যক্তিগত সহকারীর ওপর চাপালেও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশেষত যে দলটি ‘সৎ লোকের শাসন চাই’ স্লোগানে মুখর, এই ধরনের নৈতিক স্খলন তাদের দ্বিচারিতা ও কপটতা হিসেবে গণ্য হতে বাধ্য।

‘ইসলামি মূল্যবোধ’-এর ধারক হিসেবে নিজেদের হাজির করে রাজনৈতিক ময়দানে শক্তি অর্জন করেছে জামায়াত। সেই দলের একজন এমপি যখন জনগণের করের টাকা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করতে উদ্যত হন, তখন তা নিছক ব্যক্তিগত অপকর্ম নয়, বরং গোটা দলীয় কাঠামোর জবাবদিহিতার অভাবকে উন্মোচিত করে।

সংসদ সদস্য বাচ্চু দাবি করেছেন, তিনি তালিকাটি দেখেননি; তার ব্যক্তিগত সহকারী আবু সালেহ মোহাম্মদ গোফরান তা জমা দিয়েছেন এবং তাকে ইতোমধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে। কিন্তু এখানে কয়েকটি অসঙ্গতি স্পষ্ট। যেমন, সংসদ সদস্যের ঐচ্ছিক তহবিল তার নিজের নামে বরাদ্দ হয়। এই তহবিলের কোন বরাদ্দ তিনি অনুমোদন করবেন, তা তার ব্যক্তিগত দায়িত্ব। ব্যক্তিগত সহকারীকে দোষারোপ করলেও আইনগত ও নৈতিক দায়ভার তার কাঁধেই থাকে।

সংসদ সচিবালয়ে জমা দেওয়া যেকোনো তালিকা এমপির অফিস থেকে পাঠানো হয়। ‘তালিকা দেখার সুযোগ হয়নি’- এই কথা যদি সত্যিও হয়, তাহলেও তা দায়িত্বে অবহেলারই নামান্তর।

তালিকায় ‘ফাইজা, পিতা মো. বাচ্চু’ এবং ‘ফাইজা, পিতা মো. আতাউর’- একই ব্যক্তিকে দুই নামে অন্তর্ভুক্ত করে ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। এটি ইচ্ছাকৃত স্বজনপোষণের অনৈতিক কৌশল বলে প্রতীয়মান হতে পারে।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্রমাগত ‘নৈতিকতা’, ‘শুদ্ধতা’ এবং ‘ইসলামি শাসন’-এর কথা বললেও তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি, নৈতিক স্খলন, এমনকি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও।

এই প্রেক্ষাপটে এমপি বাচ্চুর ঘটনা দলটির জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর। বিশেষত, যখন দলটি ‘সৎ মানুষের শাসন’-এর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম দাঁড় করাতে চায়, তখন তাদেরই নির্বাচিত প্রতিনিধি যদি জনগণের টাকা পরিবারের সদস্যদের দিতে চান, তাহলে দলটির মূল বক্তব্য হয়ে দাঁড়ায় কেবল স্লোগান, বাস্তবতা নয়।

এই ঘটনা আরও একটি বড় প্রশ্ন তুলেছে, সংসদ সচিবালয়ের মনিটরিং ব্যবস্থা কোথায়? যখন এমপিরা তার ঐচ্ছিক তহবিলের প্রস্তাবনা জমা দেন, তখন সচিবালয়ের পক্ষ থেকে কি কোনো যাচাই-বাছাই হয় না? তালিকায় কোনো ব্যক্তির নাম দুবার থাকলে তা দেখার দায়িত্ব কার? এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করতে পারলে সংসদ সচিবালয় কার্যত একটি ‘রাবার স্ট্যাম্পে’ পরিণত হয়।

তবে এই ঘটনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তালিকাটি ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গণমাধ্যম ও সাধারণ নেটিজেনরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।

সংসদ সদস্য নিজে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ‘বেকসুর খালাস’ পেতে চাইলেও, জনমত তাকে তা দিতে রাজি হয়নি। এটি ক্ষমতাশালীদের জন্য একটি সংকেত যে, জনগণ আর চোখ বন্ধ করে রাখছে না।

সংসদ সদস্যের এই কেলেঙ্কারি থেকে সংশ্লিষ্টদের জন্য কিছু শিক্ষণীয় ও করণীয় আছে। যেমন, প্রত্যেক এমপির ঐচ্ছিক তহবিলের বরাদ্দ যেন অনলাইনে প্রকাশিত হয়, এবং সেখানে প্রাপকদের সঙ্গে এমপির সম্পর্ক (যদি থাকে) স্বতঃস্ফূর্তভাবে চিহ্নিত হয়, তেমন ব্যবস্থা করা। কোনো এমপি যদি পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়কে এই তহবিল থেকে বরাদ্দ দেন, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়- এমন স্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে।

আতাউর রহমান বাচ্চুর এই কেলেঙ্কারি প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা ও রাজনীতিতে নৈতিকতার সংকটের প্রতিফলন। যারা ‘সৎ লোকের শাসন’-এর কথা বলেন, তাদের প্রথমে নিজেদের কারবারে সততা দেখাতে হবে। নইলে জনগণের রায় হবে কঠোর। এবং সেই রায় কোনো ব্যক্তিগত সহকারীকে বরখাস্ত করে আটকানো সম্ভব নয়।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)