যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

শিক্ষা ছুটি নিয়ে বিদেশ থেকে না ফেরা: উদার নীতি পুনর্বিবেচনা জরুরি

প্রকাশ : রবিবার, ২৮ জুন,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
শিক্ষা ছুটি নিয়ে বিদেশ থেকে না ফেরা: উদার নীতি পুনর্বিবেচনা জরুরি

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪ বছরের ইতিহাসে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে আর কর্মস্থলে ফেরেননি ৩৯ জন শিক্ষক। এটি বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের বহু শিক্ষক বছরের পর বছর বিদেশে অবস্থান করেন এবং তাদের নিয়ে গণমাধ্যমে বিস্তর রিপোর্ট হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না।

যে টাকা এবং সুযোগ-সুবিধায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিদেশে পাঠানো হয়, সেই অর্থের মূল্য তো আছেই, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো- ‘বিশ্বাস’ ও ‘দায়বদ্ধতার’ জায়গাটি কোথায়? শিক্ষা ছুটি কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, যার প্রতিদান হিসেবে আশা করা হয় উন্নত জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে ফিরে আসবেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক। এবং তার অর্জিত জ্ঞান ছড়িয়ে দেবেন শিক্ষার্থীদের মাঝে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা যথেষ্ট উদার। চাকরির দুই বছর পর থেকে শুরু করে পিএইচডির জন্য পাঁচ বছর বেতনসহ এবং আরও দুই বছর বিনা বেতনে সর্বোচ্চ সাত বছর ছুটির সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, শিক্ষককে প্রায় সাত বছর বিশ্ববিদ্যালয় তার বেতন দিয়ে ধরে রাখে, শুধু এই আশায় যে তিনি ফিরে এসে প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের জ্ঞানপিপাসা মেটাবেন। কিন্তু যখনই দেখা যায়, নির্ধারিত মেয়াদ শেষেও শিক্ষক ফিরছেন না, বরং ইস্তফা দিচ্ছেন অথবা আইনি জটিলতা তৈরি করছেন, তখনই এই উদার নীতি পুনর্বিবেচনার কথা ওঠে। কিন্তু নীতি বদলায় না, সুযোগ গ্রহণকারী শিক্ষকদের অনেকের চরিত্রও একই থাকে।

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হারুনর রশীদ খান যথার্থই বলেছেন, এটি যেমন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতি, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষক সংকট তৈরি করে। যে পদগুলো শূন্য থাকে, সেখানে নতুন নিয়োগ দেওয়া যায় না। ফলে বাড়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা জটিলতা, কমে যায় গবেষণার মান। কয়েকজন শিক্ষকের স্বার্থপর সিদ্ধান্ত যখন পুরো একটি বিভাগ বা অনুষদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে, তখন তা ভয়ঙ্কর জটিলতা তৈরি করে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের করণীয় কী? রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ‘নির্ধারিত সময় শেষে যোগদান না করলে করণীয় সীমিত হয়ে পড়ে’- এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে আমরা থেমে থাকতে পারি না। আইনি নোটিস, মামলা, টাকা ফেরতের চেষ্টা- এগুলো প্রক্রিয়াগত পদক্ষেপ হলেও তা প্রতিরোধমূলক নয়। বরং প্রয়োজন সুস্পষ্ট বন্ড ব্যবস্থা, যাতে শিক্ষক ছুটিতে যাওয়ার আগে একটি আইনি ও আর্থিক চুক্তিতে আবদ্ধ হন যে, নির্ধারিত সময়ে ফিরতে না পারলে তাকে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পাশাপাশি, ফিরে আসা শিক্ষকদের জন্য ক্যারিয়ার ইনসেনটিভ বা উন্নত গবেষণা সুবিধার নিশ্চয়তা দিতে হবে, যাতে বিদেশে থাকার চেয়ে দেশে ফিরে আসা আরও আকর্ষণীয় মনে হয়।

ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. নূরুন্নবী জানিয়েছেন, প্রায় পাঁচ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এখনও আদায় হয়নি। এই অর্থ শুধু আর্থিক পরিসংখ্যান নয়; এটি শিক্ষার জন্য বরাদ্দের অংশ। যখন কোনো শিক্ষক ফেরেন না, তখন তার বেতন-ভাতা তো বটেই, ওই পদে নতুন কাউকে নিয়োগ না দেওয়ার ফলে যে সুযোগ হারায় শিক্ষার্থীরা, তার কোনো আর্থিক মূল্যায়ন হয় না। তাই প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে। মামলা ও নোটিসের পাশাপাশি শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, তাদের সমস্যা বোঝা এবং ফিরে আসার পথে যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকে, তা চিহ্নিত করাও জরুরি।

তবে মোটা দাগে শিক্ষকদের মানসিকতা পরিবর্তনের দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় যখন তাকে শিক্ষা ছুটি দেয়, তখন এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের সুযোগ নয়, এটি দেশের জন্য কিছু করার অঙ্গীকার। অনেক দেশেই শিক্ষকরা বিদেশে গবেষণা শেষে ফিরে আসেন, কারণ তারা বোঝেন, নিজের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়কে শক্তিশালী করাই বড় সার্থকতা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯ শিক্ষকের ঘটনা আমাদের শেখায়, উদারতা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন কঠোর জবাবদিহিতা। অন্যথায় ভবিষ্যতেও ‘শিক্ষা ছুটি’ নামে এই মহৎ উদ্যোগটি ক্রমেই ‘দেশান্তর হওয়ার সুযোগ’ হয়ে উঠবে, যা কখনোই কাম্য নয়।

শিক্ষা ছুটি নিয়ে বিদেশে গিয়ে না ফেরার কালিমা আমাদের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার গায়ে এক দাগ। এই দাগ মুছে ফেলতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)