সম্পাদকীয়
জনগণের করের টাকায় নির্মিত প্রতিটি অবকাঠামোই হওয়া উচিত টেকসই, মজবুত ও মানসম্মত। কিন্তু খুলনার কয়রা উপজেলায় এলজিইডির অধীনে নির্মাণাধীন একটি সড়কের চিত্র দেখে মনে হচ্ছে, জনগণের আড়াই কোটি টাকা যেন নষ্ট করার জন্যই ব্যয় করা হচ্ছে। বিটুমিন ও পাথরের মিশ্রণে যে সড়কটি হওয়ার কথা ছিল দীর্ঘস্থায়ী, তা হাতের স্পর্শেই আস্তরণ উঠে আসার মতো অবস্থায় পৌঁছেছে। এটি শুধু দুর্নীতিই নয়, জনবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা।
রাস্তাটিতে ধুলোবালি পরিষ্কার না করেই বিটুমিনের ঢালাই দেওয়া হয়েছে, যা প্রাথমিক প্রকৌশলগত ভুল বা অবহেলা। দ্বিতীয়ত, নামমাত্র প্রাইম কোড ব্যবহার এবং মিশ্রণে বিটুমিনের পরিমাণ এতটাই কম যে, এক সপ্তাহ আগের ঢালাইও হাত দিয়ে টেনে তোলা যাচ্ছে। তৃতীয়ত, কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিল তুলে নিয়েছে- যা প্রশাসনিক তদারকির চরম ব্যর্থতা। চতুর্থত, এলজিইডির প্রকৌশলীদের সাইটে অনুপস্থিতি এই অনিয়মকে উৎসাহিত করেছে।
ঢালাইয়ের সময় তদারকি প্রকৌশলীদের উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। তারা সেখানে না থাকলে ঠিকাদার যেমন খুশি কাজ করতে পারেন। এটাই এখানে ঘটেছে। প্রকৌশলী শাফিন শোয়েবের ‘জমাট বাঁধতে সময় লাগে’- এই ব্যাখ্যা যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ জমাট বাঁধা আর আস্তরণ উঠে যাওয়া এক কথা নয়। কোনো মানসম্মত কাজে ঢালাইয়ের এক সপ্তাহের মধ্যেই আস্তরণ উঠে যায় না। আর ঠিকাদারের ‘বৃষ্টির অজুহাত’ তো আরও হাস্যকর; বৃষ্টি এলেই যদি সড়ক নষ্ট হয়, তাহলে সেই নির্মাণ পদ্ধতি কি আদৌ গ্রহণযোগ্য?
লুটপাটের এই ঘটনার সঙ্গে কারা কারা যুক্ত তা বের করতে দ্রততার সাথে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করুন। তদন্তের আগেই সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ তদন্ত না করেই বলে দেওয়া যায়, এখানে এই দুই পক্ষের সরাসরি জোগসাজস রয়েছে। নিম্নমানের কাজ ও বিল উত্তোলনের অসঙ্গতি খতিয়ে দেখে ঠিকাদারকে জরিমানা করা ছাড়াও তাকে ব্ল্যাকলিস্ট করার ব্যবস্থা করুন। তদন্ত যেন নিরপেক্ষ হয়, তার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে দ্রুত সরিয়ে দিন। ঠিকাদারের নিজস্ব খরচে পুরো সড়ক পুনরায় নির্মাণ করতে বাধ্য করুন। তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে প্রকল্প পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনা এবং সাইটে প্রকৌশলীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
কয়রার এই সড়কটিতে আকস্মিকভাবে এমন অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে, তা কিন্তু নয়। বাংলাদেশের বহু জায়গায় এমন লুটপাটের ধারাবাহিকতা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। যশোর অঞ্চলের সড়কগুলোর দিকে তাকালে তা খালি চোখে পরিষ্কার দেখা যায়। জনগণের টাকা তাদের উপকারের জন্য ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।