সম্পাদকীয়
যশোরের বাঘারপাড়ায় মাত্র ১১ মাস বয়সী এক অবুঝ শিশু সাহাবীর হোসেন ধারালো কাঁচির কোপে জখম হয়েছে। পাশবিক এই ঘটনার পেছনে যে কাহিনি, তা আরও বেশি উদ্বেগজনক। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করায় আক্রান্ত হয়েছেন আসাদুল ইসলাম নামের সেই ব্যক্তি, যার কোলে ছিল এই শিশু। মাদক ব্যবসা নির্বিঘ্ন করতে এই ধরনের অপতৎপরতার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই।
পায়ে গুরুতর আঘাত পাওয়া শিশু সাহাবীর এখন যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, তার পায়ের ক্ষত গভীর। এই ক্ষত কেবল মাংসের নয়; এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের গভীরে চিরস্থায়ী এক দাগ হয়ে থাকবে।
বাঘারপাড়ার এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের খবর আসছে আশঙ্কাজনক হারে। প্রতিটি ঘটনাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কোন দিকে এগোচ্ছি। অবশ্য কিছু দৃষ্টান্তমূলক রায় আদালত থেকে আসছে, যা আইনের চোখ যে এখনও সজাগ, তার প্রমাণ। নিহত শিশু ফিরে আসে না, কিন্তু শাস্তির সেই কঠোরতা নির্যাতিত পরিবারকে কিছুটা সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু আদালত যত রায়ই দিন, মূল প্রতিরোধ গড়ে উঠতে হবে সমাজের ভেতর থেকেই।
আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, মাগুরা শহরে সরকারি দলের দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে গর্ভবতী নারীর পেটে গুলি বিদ্ধ হওয়ার ঘটনা শেখ হাসিনার শাসনামলে আলোড়ন তুলেছিল। সেই পৈশাচিক ঘটনাও আমাদের সমাজের অপরাধীদের বিন্দুমাত্র টলাতে পারেনি। আজও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, দলীয় স্বার্থ কিংবা মাদকচক্রের দাপটের নামে শিশুদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে; যা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুন-খারাবি নৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু শিশুদের ওপর অমানবিকতা সমাজকে আলোড়িত করে, এটা সত্য। তা সত্ত্বেও সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, এ ধরনের অপরাধীদের প্রতিহত করতে সামাজিক ঐক্যের অনুপস্থিতি। আমরা ক্ষুব্ধ হই, সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ করি, কিন্তু প্রতিবেশী হিসেবে, পাড়া-মহল্লার মানুষ হিসেবে আমরা কি যথেষ্ট সোচ্চার? মাদক কারবারিদের তালিকা আমরা জানি, অথচ থানায় অভিযোগ দিতে দ্বিধা করি। আমরা শিশু নির্যাতনের খবর পড়ি, কিন্তু স্কুল-মসজিদ-মন্দিরে শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠনে তেমন আগ্রহ দেখাই না।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ একটাই- নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিজেকে দায়বদ্ধ মনে করবেন। প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, এবং মাদকের মতো সামাজিক ক্যানসারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শিশু সাহাবীরের পায়ের রক্ত যেন বৃথা না যায়। সে রক্ত যদি আমাদের বিবেককে জাগ্রত করে, তবে হয়তো ভবিষ্যতে আর কোনো শিশুকে সন্ত্রাসী হানার শিকার হয়ে হাসপাতালের শয্যায় কাঁদতে হবে না।
সমাজের প্রতি আমাদের আহ্বান, শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ; তাদের ওপর হাত তোলা মানে নিজের অস্তিত্বকে ধ্বংস করা। আজ না হলে কাল, আমাদেরই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ এই পৈশাচিকতার অবসান ঘটাবে- এ প্রত্যাশা থাকছে।