সম্পাদকীয়
কোনো কোনো পুলিশ সদস্যের নীতি-নৈতিকতা নিয়ে সমাজে অভিযোগের পাহাড় আছে তারই এক ভয়াবহ প্রতিফলন ঘটেছে খুলনার সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় কর্মরত এক পুলিশ দম্পতির বিরুদ্ধে গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের খবরে। বৃহস্পতিবার এএসআই সঞ্জয় মিত্র ও তার স্ত্রী এএসআই পপি মিত্রকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। এই প্রতিবেদনটি আমাদের সমাজব্যবস্থার একটি গভীর ফাটল উন্মোচন করেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সমাজের সবচেয়ে সুরক্ষিত ও বিশ্বস্ত মানুষ হবেন- এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু যখন এই বাহিনীর সদস্য দম্পতি গৃহকর্মীকে গরম কড়াইয়ের ছ্যাঁকা দিয়ে নির্যাতন করেন, তখন তা কেবল একটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি জনগণের আস্থায় আঘাত হানার শামিল। নির্যাতনের শিকার মিলন চন্দ্র দাশ নামে ওই নারী পাঁচ বছর ধরে তাদের সংসারে কাজ করছেন। একান্ত নিরুপায় না হলে কেউ গৃহপরিচারিকার কাজ নেয় না। কিন্তু যাদের ওপর আস্থা রেখে এই নারী কাজে যোগ দিয়েছিলেন, তাদের দ্বারাই অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠলো।
আমাদের সংবিধান ও আইন প্রতিটি নাগরিককে নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়। বিশেষ করে, যারা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। গৃহপরিচারিকারাও তাদেরই অংশ। এই ঘটনায় গৃহকর্মীর মা মিনতি রানী দাস থানায় মামলা দায়ের করেছেন এবং আদালত দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছেন- এটি আইনি প্রক্রিয়ার ইতিবাচক দিক। আমরা এর প্রশংসা করি। এর মাধ্যমে অভিযুক্ত দম্পতি ও তাদের মতো অনেকের কাছে একটি বার্তা যাবে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কেবল বিচারিক প্রক্রিয়াই কি যথেষ্ট? যারা আইন প্রয়োগের দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের কারও কারও মানসিকতা, প্রশিক্ষণ ও নৈতিকতা সম্পর্কে কি আমাদের পুনর্বিবেচনা করা উচিত নয়? পুলিশের ভেতরে এমন সদস্য থাকা রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক, যারা নিজেদের কর্তৃত্বকে দুর্বলের ওপর জুলুমের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
এই ঘটনার পর খুলনা মহিলা পরিষদ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো যে কঠিন শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, তা সঙ্গত। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে কেবল এই দম্পতির জন্যই নয়, ভবিষ্যতে ক্ষমতার দম্ভে অন্যরাও এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হতে পারেন।
একইসঙ্গে, গৃহপরিচারিকাদের মতো অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা সময়ের দাবি। তাদের কাজের শর্ত, নিরাপত্তা ও ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করতে হবে। মিলনের দগ্ধ শরীর যেমন এখন ওসিসি সেন্টারে চিকিৎসা পাচ্ছে, তেমনি তার আইনি লড়াইও যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, সে দিকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নজর রাখতে হবে।
প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক রবিউল গাজী উজ্জ্বল যেমনটি করেছেন, সাধারণ নাগরিকদেরও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সমাজের দুর্বলদের জন্য সবার সচেতনতা ও সাহসী ভূমিকা অপরিহার্য। আইন ব্যবস্থার সঙ্গে জনগণের এই সহযোগিতাই পারে একটি ইনসাফের সমাজ গড়তে।