সম্পাদকীয়
ফুটবল বিশ্বকাপ বিশ্বব্যাপী এক উৎসবের আবহ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়; বরং এখানে ফুটবলপ্রেম কখনো কখনো উন্মাদনায় রূপ নেয়।
সাম্প্রতিককালে মাগুরার আল আমিনের মোবাইল টাওয়ারে পতাকা টাঙানোর দুঃসাহসিকতা এবং যশোরের কেশবপুরে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে জার্সি পরিবর্তন করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার ঘটনা আমাদের এই আবেগের সীমা-পরিসীমা নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছে।
প্রথম ঘটনায়, আল আমিন প্রায় দুইশ’ ফুট উঁচু টাওয়ারের চূড়ায় কোনো নিরাপত্তাসরঞ্জাম ছাড়াই আরোহণ করেছেন। আর্জেন্টিনা ও মেসির প্রতি ভালোবাসা তার মধ্যে সাহস জোগালেও, এই কাজটি যে কেবল ব্যক্তিগত ঝুঁকি নয়, তা আশপাশের মানুষদেরও উদ্বেগে ফেলে দেয়। ভক্তির প্রকাশ কীভাবে হতে পারে, তার একটি সীমারেখা থাকা উচিত। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে এমন কর্মকাণ্ড কোনো আদর্শ নয়, বরং তা অনুকরণীয় হলে ভবিষ্যতে আরও সম্ভাব্য বিপজ্জনক ঘটনার উৎস হতে পারে।
দ্বিতীয় ঘটনায়, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক সমর্থকের গায়ে ব্রাজিলের জার্সি পরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা মানহানির অভিযোগে থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়িয়েছে। এটি প্রমাণ করে, ডিজিটাল জগতে আমাদের মজাও কখনো কখনো আইনি সীমা লঙ্ঘন করে। কারও সম্মান বা অনুভূতির সঙ্গে খেলা কোনো আমোদ-আহ্লাদ নয়, বিশেষত যখন তা প্রকাশ্য মাধ্যমেই করা হয়।
এই দুই ঘটনাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ফুটবল ভালোবাসা যেমন বৈধ, তেমনি তার বহিঃপ্রকাশও হতে হবে সমাজবদ্ধ, নিরাপদ ও সচেতন। বিশ্বকাপ তো উৎসব, তার অর্থ হলো মিলন, উল্লাস, বন্ধুত্ব। কোনো পতাকা সবচেয়ে উঁচুতে টাঙানোর মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। প্রশাসন ও সচেতন মহল সঠিকভাবেই এসব বিপজ্জনক কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট দলের সমর্থককে ভিন্ন দলের সমর্থক হিসেবে প্রচার করা রীতিমতো অন্যায়ের পর্যায়ে পড়ে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রকৃত ভক্ত কখনো নিজেকে কিংবা অন্যকে বিপদে ফেলে না। আবেগকে সংযত করতে পারাই বড় হওয়ার পরিচয়। ফুটবল আমাদের ঐক্যবদ্ধ করুক, বিচ্ছিন্ন নয়; আনন্দ দিক, আতঙ্ক নয়। এবারের বিশ্বকাপে আমরা যেন গর্জন করি স্টেডিয়ামে বা স্ক্রিনের সামনে, কিন্তু মাথা ঠান্ডা রেখে- এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।