তসলিম শিমুল
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি আর্জেন্টিনা। দিয়েগো ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা কিংবা অ্যাঞ্জেল দি মারিয়াদের দেশটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সফল দল। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে একটি প্রশ্ন বহুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে- ব্রাজিল, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড কিংবা কলম্বিয়ার মতো দেশগুলোর জাতীয় দলে বিপুল সংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার দেখা গেলেও আর্জেন্টিনার দলে কেন তাদের উপস্থিতি প্রায় নেই?
প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় আর্জেন্টিনার ইতিহাসে। কারণ বিষয়টি কেবল ফুটবলের নয়, বরং দেশটির জনসংখ্যাগত ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
বুয়েনস আইরেসের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ছিলেন আফ্রো-বংশোদ্ভূত
বর্তমান আর্জেন্টিনাকে অনেকেই ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত মানুষের দেশ হিসেবে জানেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ঊনিশ শতকের শুরুতে রাজধানী বুয়েনস আইরেসের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ ছিলেন আফ্রো-আর্জেন্টাইন বা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। তাহলে আজ তাদের উপস্থিতি এত কম কেন?
গবেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে যুদ্ধ, মহামারি, ব্যাপক ইউরোপীয় অভিবাসন এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক-প্রশাসনিক নীতির প্রভাব।
যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছিল হাজারো প্রাণ
আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং বিশেষ করে ট্রিপল অ্যালায়েন্স যুদ্ধে (১৮৬৫-১৮৭০) বিপুলসংখ্যক আফ্রো-আর্জেন্টাইন পুরুষকে সেনাবাহিনীতে পাঠানো হয়েছিল। সামনের সারিতে যুদ্ধ করার কারণে তাদের মৃত্যুর হার ছিল অত্যন্ত বেশি। ফলে আফ্রো-আর্জেন্টাইন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত কমতে শুরু করে।
মহামারির ভয়াবহ আঘাত
ঊনিশ শতকের শেষভাগে বুয়েনস আইরেসে ইয়েলো ফিভার ও কলেরার মতো মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। দরিদ্র ও প্রান্তিক এলাকায় বসবাসকারী আফ্রো-আর্জেন্টাইনদের ওপর এর প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই মহামারিগুলো কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা হ্রাসে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
ইউরোপীয় অভিবাসনে বদলে যায় দেশের চেহারা
১৮৫০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে আর্জেন্টিনা সরকার ইউরোপ থেকে অভিবাসীদের ব্যাপকভাবে স্বাগত জানায়। ইতালি ও স্পেন থেকে লাখ লাখ মানুষ দেশটিতে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
এর ফলে মোট জনসংখ্যার তুলনায় আফ্রো-বংশোদ্ভূতদের অনুপাত নাটকীয়ভাবে কমে যায়। আর্জেন্টিনা ধীরে ধীরে একটি ইউরোপীয় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজে পরিণত হয়।
মিশ্র বংশধারার প্রভাব
দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপীয় ও আফ্রো-আর্জেন্টাইন জনগোষ্ঠীর মধ্যে আন্তঃবিবাহের ফলে বহু মানুষের পরিচয় ধীরে ধীরে মিশ্র রূপ নেয়। অনেক পরিবার পরবর্তী প্রজন্মে নিজেদের ইউরোপীয় পরিচয়ের সঙ্গে বেশি যুক্ত করতে শুরু করে। ফলে আফ্রো-আর্জেন্টাইন পরিচয় জনপরিসরে আরও কম দৃশ্যমান হয়ে পড়ে।
ফুটবলে কেন দেখা যায় না
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্জেন্টিনায় কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। ফলে জাতীয় দলে তাদের প্রতিনিধিত্বও সীমিত।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলারদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বরং দেশের জনসংখ্যাগত বাস্তবতাই জাতীয় দলের গঠনকে প্রভাবিত করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেনেগাল, কেপ ভার্দে, কলম্বিয়া ও অন্যান্য লাতিন আমেরিকান দেশ থেকে অভিবাসন বাড়ায় আর্জেন্টিনার বড় শহরগুলোতে আফ্রো-সংস্কৃতির উপস্থিতি আবারও দৃশ্যমান হচ্ছে।
ইতিহাসের আড়ালে চাপা পড়া এক পরিচয়
২০১০ সালের সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী, প্রায় দেড় লাখ মানুষ নিজেদের আফ্রো-আর্জেন্টাইন হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। গবেষকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।
আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার কম দেখা যাওয়ার কারণ তাই কেবল ফুটবল নয়; এটি দেশটির কয়েক শতাব্দীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফল।
ফুটবল মাঠে তাদের উপস্থিতি সীমিত হলেও আফ্রো-আর্জেন্টাইনদের সাংস্কৃতিক অবদান, বিশেষ করে টাঙ্গো সংগীত ও নৃত্যের বিকাশে, আজও আর্জেন্টিনার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে।
লেখক: ক্রীড়ালেখক