সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে মসজিদ শুধু ইবাদতের জায়গা নয়, এটি শান্তি, নিরাপত্তা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। পবিত্র এই স্থানে সাধারণত বড় ধরনের অপরাধমূলক ঘটনা ঘটে না। কিন্তু খুলনার দৌলতপুরের বিএল কলেজ-সংলগ্ন বিদ্যুৎ জামে মসজিদে ১৪ জুন ভোরে ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনা মানুষকে গভীর শোক ও উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে।
ফজরের নামাজ শেষে কোরআন তেলাওয়াতরত শেখ লোকমান হাকিম (৫০) ও জিকিররত আলম মন্ডল (৫৫)-এর ওপর দুটি মোটরসাইকেলে আসা অস্ত্রধারীরা পাঁচ রাউন্ড গুলি চালায়। এই হামলায় চারটি গুলি লোকমানের শরীরে বিদ্ধ হয়, অন্যদিকে আলম মন্ডলও গুরুতর আহত হন। বর্তমানে উভয়ই হাসপাতালে জীবন-মৃত্যু সন্ধিক্ষণে। আলম মন্ডলের গলা ভেদ করে গুলি বেরিয়ে গেছে, অপর গুলিটি তার ফুসফুসের কাছে আটকে ছিল।
ঘটনাটি সাধারণ কোনো অপরাধ নয়; এটি মসজিদের পবিত্রতা ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। মসজিদের ভেতরে নামাজরত অবস্থায় নয়, বরং আল্লাহর ঘরে কোরআন তেলাওয়াতের সময় যেখানে মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রশান্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ থাকার কথা, সেখানে এ ধরনের হিংসা অকল্পনীয়। ব্যবসার বিরোধের জেরে দুর্বৃত্তরা যদি মসজিদকে যুদ্ধক্ষেত্র বানাতে পারে, তবে সাধারণ মুসল্লিরা কোথায় নিরাপদ থাকবেন?
ঘটনার পেছনে চরমপন্থী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা বা চোরাই তেল কারবার-সংক্রান্ত বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। এটি আভাস দিচ্ছে যে, অপরাধটির পেছনে বহুমাত্রিক কারণ থাকতে পারে।
ঘটনার পর ওজোপাডিকোর ঠিকাদার ও তেল কোম্পানির এজেন্ট হিসেবে পরিচিত লোকমান হাকিমের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির পেশাগত বা রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তা মসজিদে তাকে গুলি করার অপরাধকে কখনোই যৌক্তিকতা দিতে পারে না। এটি পরিকল্পিত ও নৃশংস হত্যাচেষ্টা। এবং এই পরিকল্পনা যেখান থেকে এসেছে, সেটির শেকড় খুঁজে বের করা পুলিশের দায়িত্ব।
পবিত্র স্থান মসজিদের নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নয়, এটি সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিকেরও কর্তব্য। কিন্তু আজকের বাস্তবতা হলো, যে জায়গায় দিনে পাঁচবার মানুষ আল্লাহর দরবারে মাথা নত করে, সেই জায়গায় অস্ত্রের মুখোমুখি হতে হলো মুসল্লিদের। এই সমাজকে আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি?
ঘটনার বিচার দ্রুত ও স্বচ্ছ হতে হবে। মসজিদের সিসিটিভি ফুটেজ দ্রুত উদ্ধার করে হামলাকারীদের শনাক্ত করতে হবে। কেবল তেল ব্যবসার দ্বন্দ্ব অথবা ব্যক্তিগত শক্রতা নয়, বরং এই ঘটনার পেছনে বড় কোনো চক্র কাজ করছে কিনা, পুলিশ তা নিশ্চয় খতিয়ে দেখবে। প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের মুখোমুখি করতে না পারলে মানুষ মসজিদকেও অনিরাপদ ভাববে; যা এদেশের হাজার বছরের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের আচরণের সাথে যায় না। এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কিছু হতে পারে না।