সম্পাদকীয়
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে একটি পাটক্ষেতের আইলে রাত কাটছে নিরুপায় ১২ নারী-শিশু ও পুরুষের। পুশইনের চেষ্টার শিকার এই আদমসন্তানেরা নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক দাবি করলেও তাদের হাতে নেই কোনো বৈধ কাগজপত্র। এই কারণ ছাড়াও এই মানুষদের যে প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক রীতি ও বিধির লঙ্ঘন। সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ তাদের নিতে অস্বীকার করেছে।
‘বাংলাদেশি’ বলে সন্দেহ করে মানুষকে জোর করে ঠেলে দেওয়ার এই তৎপরতা চলছে ভারতের পশ্চিমবাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে। ভারতের শাসক দল উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি বাংলাদেশ-সংলগ্ন পশ্চিমবাংলায় ক্ষমতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কুৎসিত চেহারা দেখাতে শুরু করেছে। মুসলিমসহ অন্য সব ধর্মের মানুষ তাদের কাছে অনিরাপদ। দলটির নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বেড়াচ্ছে, ভারত হলো হিন্দুদের আবাস। এখানে অন্য ধর্মের কারও স্থান হবে না।
ভারতের অন্য প্রদেশে যা-ই ঘটুক না কেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য পশ্চিমবাংলা ছিল এতোদিন মোটামুটি নিরাপদ একটি জায়গা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পর স্বাধীন ভারতের এই প্রদেশ দীর্ঘদিন শাসন করেছে পর্যায়ক্রমে জাতীয় কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি ও তৃণমূল কংগ্রেস। তিনটি রাজনৈতিক দলই অসাম্প্রদায়িকতা চর্চা করেছে। ফলে সেখানকার মুসলিমসহ অন্য ধর্মাবলম্বীরা নিরাপত্তার তেমন কোনো অভাব বোধ করেননি। কিন্তু উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের ক্ষমতারোহণের সাথে সাথে পরিস্থিতি ইউ টার্ন নিয়েছে। এখন সন্দেহভাজন বাংলাদেশিদের ধরে ধরে তারা জোর করে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে; যা আন্তর্জাতিক রীতিনীতির লঙ্ঘন।
বাংলাদেশ প্রথম থেকেই বলে আসছে, যদি কারও নাগরিকত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে তো প্রমাণসাপেক্ষে তা কূটনৈতিক চ্যানেলে দুই দেশের মধ্যে সমাধানযোগ্য। যথাযথ প্রমাণ পেলে বাংলাদেশও তার নাগরিকদের যেকোনো আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে ফিরিয়ে নিতে আপত্তি করবে না। কিন্তু বিজেপির রাজনীতির ধরন আলাদা। তারা এই পথে হাঁটবে না। জোর করে ঠেলে দেওয়ার মধ্যে রাজনীতিতে সুবিধা অর্জনের ব্যাপার আছে। বিজেপি তাদের উগ্র সমর্থকদের দেখাতে চায় যে, দেখো, আমরা হিন্দুদের স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন।
প্রশ্ন হলো, একবিংশ শতাব্দীতে এই উগ্র জাতীয়তাবাদী, ফ্যাসিবাদী ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি যে অচল, তা তাদের বোঝাবে কে? তারা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সুবিধা অর্জনের জন্য হেন পশ্চাৎপদ চিন্তা নেই, যার প্রতিফলন ঘটায় না। তাদের দায়িত্বশীল নেতারা গোমূত্র পানে মানুষকে উৎসাহিত করেন। তাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহাসিক উপাসনালয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তারা ‘গরু কোরবানি দেওয়া যাবে না’ বলে ফরমান জারি করে। ইসলাম ধর্মে বিধান থাকলেও খোলা স্থানে ঈদের জামাত আদায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এমনকি গরুর মাংস বহন করা হচ্ছে- স্রেফ এমন সন্দেহের বশে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। এমন অসভ্যতা দুনিয়ার কোথাও দেখা যাবে না।
এমন পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে মানুষজনকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার হীন প্রচেষ্টা রুখে দিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) যে শক্ত পদক্ষেপ নিয়েছে, আমরা তার প্রশংসা করি। প্রতিবেশির সাথে সৃষ্ট সব সমস্যার সমাধান হতে হবে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে, আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি মেনে। এর বাইরে যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবেলা করা এই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সাথে সম্পর্কিত। এখানে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
ভারতকে মনে রাখতে হবে, তাদের পছন্দের দল ও নেতা আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা এখন আর ক্ষমতায় নেই যে, যা ইচ্ছা তাই আদায় করে নেওয়া যাবে, সীমান্তে যেমন ইচ্ছা তেমন আচরণ করা যাবে। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন এদেশের তরুণদের নেতৃত্বে লাখো মানুষ উৎখাত করেছে দিল্লির গোলামি করার জন্য না; একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র যেভাবে তার মর্যাদা রক্ষা করে চলে, বাংলাদেশও ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারে আমল থেকে এখন পর্যন্ত সেপথে হাঁটছে। সরকারের এই অবস্থানে যে মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে, তা বিভিন্ন সীমান্তে বিজিবিকে সহায়তার জন্য দলে দলে সাধারণ মানুষের এগিয়ে আসার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়েছে।