সম্পাদকীয়
যশোরের আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাছ ব্যবসায়ী ইমরানের মৃত্যুর ঘটনা আবারও এই গ্রুপের চিকিৎসা সক্ষমতা, প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতা, পরিবেশ ও দায়বদ্ধতার বিষয়টি সামনে এনেছে। সবে একটি তদন্ত শেষে আদ-দ্বীনের ঢাকার হাসপাতালটির লাইসেনন্স বাতিল করেছে সরকার, যেখানে একদিনে ছয়টি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনা থেকে প্রতিষ্ঠানটি কিছু শিক্ষা নিয়েছে কি না- সেই প্রশ্ন তোলাই যায়।
তীব্র জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে যশোর আদ-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম যুবক ইমরান। অপরিহার্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই একের পর এক ইনজেকশন প্রয়োগের পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি- স্বজনদের এই অভিযোগ যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি চিকিৎসকদের অনীহা ও অবহেলার অভিযোগও যদি সত্যি হয়, তাহলে সেটাও কম উদ্বেগের নয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ‘নিয়ম মেনেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল’। কিন্তু নিয়ম কি শুধু ইনজেকশন ও স্যালাইন দেওয়ার নাম? রোগীর শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক টেস্ট, পর্যবেক্ষণ- এগুলো কি চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রাথমিক নিয়ম নয়? ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ বলে মৃত্যুকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা যতই করা হোক, তাতে স্বজন হারানোর বেদনা মোটেই লাঘব হয় না। সঠিক সময়ে যথাযথ চিকিৎসা পেলে হয়তো এই রোগীর মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো। সেক্ষেত্রে একটি প্রাণই বেঁচে যেত না, বাঁচতো একটি পরিবার।
ঘটনার পর হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ, থমথমে পরিস্থিতি, পুলিশি নিয়ন্ত্রণ- এসব তো পুরনো চক্রের পুনরাবৃত্তি। প্রতিবারের মতো এবারো কি সব শেষ হবে একটি সাধারণ ডায়েরি আর একটি তদন্ত কমিটির প্রতিশ্রুতিতে? রোববার অফিস খুললে তদন্ত হবে, প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা- এমন আশ্বাসে সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনদের বেদনা কি কমে?
গুরুতর বিষয় হলো, যশোরে আদ-দ্বীন পরিচালিত হাসপাতালের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এটিই প্রথম নয়। এর আগে শহরের রেল রোডে অবস্থিত আদ-দ্বীন হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যু, অহেতুক সিজার, অপ্রশস্ত আলো-বাতাসহীন পরিবেশে রোগী রাখার বহু অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ভাঙচুরের পাশাপাশি ভুক্তভোগীরা স্বাস্থ্য বিভাগে লিখিত অভিযোগ জানিয়েও কোনো সুফল পাননি। তাহলে কি সে সব সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো আদ-দ্বীনের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল? হতেই পারে। কারণ আদ-দ্বীনের প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার শেখ মহিউদ্দিনের ভাই শেখ আফিল উদ্দিন দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। ফ্যাসিবাদী শাসন অবসানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ডা. মহিউদ্দিনের আরেক ভাই বশির উদ্দিন। আবার এখন গণতান্ত্রিক জমানায় প্রধান বিরোধীদল জামায়াতের এমপি হিসেবে যশোর-২ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ডা. মহিউদ্দিনের শ্যালক ডা. মসলেহউদ্দিন ফরিদ। ফলে সব সরকারের সময়ই আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষ তাদের প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। ঢাকায় ছয় শিশুর করুণ মৃত্যুর পর সরকারের পদক্ষেপে জামায়াতি ঘরানার লোকেরা স্পষ্টতই অসন্তুষ্ট। আদ-দ্বীন পরিচালিত সব প্রতিষ্ঠানে সিংহভাগ জনশক্তিই জামায়াতে ইসলামীর- একথা সবাই জানেন। তাদের কাছে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই মুখ্য, শিশুদের অমূল্য জীবন নয়।
আদ-দ্বীনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে যে সব অভিযোগ এসেছে, সেগুলো না হয় বাদই রাখলাম। হালের অভিযোগগুলোর মধ্যে ঢাকার বিষয়টিতে সরকার কঠোর অবস্থান নেওয়ার মতো হিম্মত দেখিয়েছে। আমরা আশা করবো, যশোরের ঘটনায়ও একইভাবে সরকারের শক্ত অবস্থান দেখতে পাবো। এই প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপারে চূড়ান্ত ফয়সালা হওয়ার বোধহয় এখনই সময়। প্রয়োজন প্রশাসনিক কঠোরতা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত এ ধরনের বেসরকারি হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শন ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ জোরদার করা। চিকিৎসা অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে রোগীর স্বজনদের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে একটি স্বচ্ছ ও দ্রুত কার্যকর মেকানিজম চালু জরুরি। বিশেষ করে আদ-দ্বীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তো এখনই প্রথম আসছে না!