সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
তিনটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর এবার সাতক্ষীরা সদর থানার একটি হত্যা মামলায় সাবেক এমপি লায়লা পারভীন সেঁজুতিকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে রোববার (১৪ জুন) সাতক্ষীরা অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিলাস মন্ডলের আদালত তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন।
২০২৫ সালের ২০ মে সাতক্ষীরা শহরের রাধানগরস্থ নিজবাড়ি থেকে আটক হন সাবেক সংসদ সদস্য সেঁজুতি। পরদিন তাকে সাতক্ষীরা সদর থানার জিআর ৭৭/২৫ মামলার সন্ধিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে সাতক্ষীরা সদর থানার জিআর ৯৬/২৫ মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ১১ জুন তাকে আসামি শ্রেণিভুক্ত করে সাতক্ষীরা সদর থানায় নতুন একটি মামলা দায়ের করা হয় এবং তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দীর্ঘ আইনগত প্রক্রিয়া শেষে হাইকোর্ট থেকে গত ফেব্রুয়ারি দুটি মামলায় এবং সম্প্রতি একটি মামলায় জামিন পান।
লায়লা পারভীন সেঁজুতির আইনজীবী অ্যাড. আল মাহামুদ জানান, কারামুক্ত হওয়ার আগেই ২০২৫ সালের একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার (শ্যোন অ্যারেস্ট) দেখানো হয়েছে। নতুন এই মামলায় তার জামিন আবেদন করা হলে বিজ্ঞ আদালত জামিন না মঞ্জুর করে তাকে ফের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, রোববার আদালতে আসামির শ্যোন অ্যারেস্টের আবেদন জানান মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। আদালত উক্ত আবেদন মঞ্জুর করলে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাৎক্ষণিক জামিনের আবেদন পেশ করেন। শুনানি চলাকালে আসামিপক্ষ দাবি করেন, দীর্ঘ প্রায় ১৩ মাস ধরে (অন্যান্য মামলায়) হাজতে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কাল্পনিকভাবে দীর্ঘদিন পর এই মামলায় তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছে। মামলার এজাহারে তার নাম নেই, কোনো সন্দেহ নেই, কেউ দোষ স্বীকারোক্তি করে এই আসামির নামও বলেনি। তাছাড়া মামলায় গ্রেপ্তার এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাতনামা একাধিক আসামি গ্রেপ্তার হলেও তারা সকলে জামিনে আছেন।
উভয়পক্ষের শুনানি শেষে বিজ্ঞ বিচারক জামিন আবেদন না মঞ্জুর করে সিডব্লিউ মূলে আসামিকে জেলা হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
বিজ্ঞ আমলী সদর ১ম আদালতে (সাতক্ষীরা) দন্ডবিধির ১৪৩/ ৪৪৭/ ৪৪৮/ ৩৬৪/ ৩০২/ ২০১/ ৩৪ ধারা মোতাবেক এই নতুন নালিশী মামলাটি দায়ের করেছেন সাতক্ষীরা সদরের ধুলিহর গ্রামের অহেদ আলীর স্ত্রী পারুল বেগম (৪৭)।
নথি পর্যালোচনা করে মামলার বিবরণীতে জানা যায়, ২০২০ সালের ২৬ মার্চ রাত আনুমানিক ১টার দিকে মামলার এজাহারনামীয় ৪৭জন এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০/১২ জন আসামি পরিকল্পিতভাবে বাদীর বসতবাড়িতে বেআইনি জনতাবদ্ধে অনধিকার প্রবেশ করে। সে সময় বাদীর শিশু কন্যাকে ঘর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয় এবং ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুরসহ ফ্রিজ, টিভি ও অন্যান্য মালামাল লুট করে প্রায় ৬/৭ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করা হয়। এছাড়া ঘর থেকে নগদ ৫০ হাজার টাকা, ৩ নম্বর সাক্ষীর সোনার গহনা (৬ ভরি, মূল্য আনুমানিক ৪ লাখ টাকা) এবং মৃত অহেদ আলীর ব্যবহৃত একটি প্লাটিনা মোটরসাইকেলসহ (মূল্য দেড় লাখ টাকা) প্রয়োজনীয় দলিলপত্র লুট করে নেওয়া হয়।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সেই সময় আসামিরা পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে ঘরে ঢুকে বাদী ও তার পরিবারের সদস্যদের মারপিট করতে থাকে। একপর্যায়ে বাদীর স্বামী অহেদ আলীকে জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বসতবাড়ি থেকে কিছু দূরে পাকা রাস্তার পাশে আমবাগানে তাকে নির্মমভাবে খুন করে ফেলে রাখা হয়। পরের দিন ২৭ মার্চ সকালে বাদীর স্বামী অহেদ আলীর লাশ উদ্ধার করা হয়।
তখন দেশে আইনের শাসন ও সুশাসন সুপ্রতিষ্ঠিত না থাকায় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রভাবশালীদের কারণে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় বাদী এতোদিন কোনো ন্যায়বিচার ও প্রতিকার পাননি। বর্তমানে দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবেশ তৈরি হওয়ায় বাদী বিজ্ঞ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
আদালত বাদীর আবেদন আমলে নিয়ে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গণ্য করে সাতক্ষীরা সদর থানাকে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা ও এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত করার আদেশ দেন।
এই মামলায় তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতক্ষীরা) মীর্জা সালাউদ্দীন, ডিবি ওসি মহিদুল, সাতক্ষীরা সদর থানার তৎকালীন ওসি মো. আসাদুজ্জামানসহ মোট ৪৭ জন এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০/১২ জনকে আসামি করা হয়।
প্রসঙ্গত, সাবেক সংসদ সদস্য লায়লা পারভীন সেঁজুতি ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেয়ে এমপি হন। তিনি সাতক্ষীরার বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ স ম আলাউদ্দীনের কন্যা।