সুবর্ণভূমি ডেস্ক
১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (সোশ্যাল মিডিয়া) ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। একই সঙ্গে গেমিং ও লাইভস্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। বিশ্বজুড়ে অনলাইন দুনিয়ায় এ ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষেত্রে এটিকে অন্যতম বড় ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সোমবার (১৫ জুন) জানিয়েছেন, শিশুরা যখন অনলাইনে থাকে, তখন তাদের মানসিক ও শারীরিক সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী স্টারমার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আমার কাছে এটি পরিষ্কার যে, শিশুদের সুরক্ষায় পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়াই একমাত্র সঠিক সিদ্ধান্ত। তিনি আরও যোগ করেন, এই আইন বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। তবে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর (বিগ টেক) একচ্ছত্র ক্ষমতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো সক্ষমতা ও দৃঢ়তা বর্তমান সরকারের রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান বেশ শক্ত করেছে যুক্তরাজ্য। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহারকারীদের সঠিক বয়স যাচাই পদ্ধতি চালু করতে, ক্ষতিকর অ্যালগরিদমে পরিবর্তন আনতে এবং মোবাইল ফোনে ধারণ করা আপত্তিকর বা নগ্ন ছবি যাতে শিশুরা ছড়াতে না পারে, সে বিষয়ে কড়া নির্দেশনা ও চাপ দেওয়া হয়েছে।
মূলত শিশুরা অনলাইনে অতিরিক্ত সময় কাটালে যে ধরনের মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, সে বিষয়ে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা ক্রমেই বাড়ছে। অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা এবং অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত বছর অস্ট্রেলিয়াও প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করেছিল।
১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে অগ্রগামী দেশ অস্ট্রেলিয়া। গত বছরের ডিসেম্বরে দেশটি টিকটক, অ্যালফাবেটের ইউটিউব এবং মেটার ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলোতে শিশুদের প্রবেশাধিকার আইন করে বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকেই শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ বাড়তে থাকায় অনেক দেশই এখন এ ধরনের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবছে।
নতুন এই বিধিনিষেধ চূড়ান্ত করার আগে যুক্তরাজ্য সরকার শিক্ষক, অভিভাবক ও তরুণদের মতামত নিয়েছে। যেখানে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা, নির্দিষ্ট সময়ের পর ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা (কারফিউ), অ্যাপ ব্যবহারের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং আসক্তি তৈরি করে, এমন ‘অ্যাডিক্টিভ ডিজাইন ফিচার’ বন্ধ করার মতো নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
সরকারি এই জরিপে অভিভাবক, প্রযুক্তি খাত ও তরুণদের কাছ থেকে ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি সাড়া পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অংশ নেওয়া অভিভাবকদের ৮৩ শতাংশেরই মত সোশ্যাল মিডিয়ার উপকারের চেয়ে এর মানসিক ঝুঁকি অনেক বেশি। আর ৯০ শতাংশ অভিভাবকই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ন্যূনতম বয়স ১৬ বছর করার পক্ষে সরাসরি রায় দিয়েছেন।
অবশ্য অনেক অভিভাবক ও রাজনীতিবিদ এই নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানালেও কিছু মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তাদের দাবি, এই পদক্ষেপ আসলেই কতটা কার্যকর হবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই। অন্যদিকে, লন্ডনের একদল স্কুলশিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা আসলে বেশ জটিল ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের।