সম্পাদকীয়
যশোরের ‘করলা গ্রাম’-এর চাষিদের উৎপাদন ও বাজারদর নিয়ে একটি প্রতিবেদন শনিবারের দৈনিক সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি শুধু একটি স্থানীয় সংবাদ নয়, বরং গভীরভাবে দেখলে বাংলাদেশের কৃষি বাজার ব্যবস্থার বাস্তবতা তুলে ধরে। যে দেশে কৃষি এখনো অর্থনীতির মেরুদণ্ড, সেখানে চাষির লোকসান মানে খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়া।
প্রতিবেদনটি পড়ে যেকোনো সংবেদনশীল পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগবে, বাম্পার ফলন কি তবে কৃষকের জন্য অভিশাপ? তিন-চার সপ্তাহের ব্যবধানে করলার দাম মণপ্রতি ২২শ’ টাকা থেকে নেমে ৫০০-৬০০ টাকায় ঠেকেছে। অথচ এখানে উৎপাদন খরচ এক বিঘায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা, শ্রমিক মজুরি ৪০০ টাকা, বাড়তি রয়েছে সার ও পরিবহন খরচ। যখন এই সব মিলিয়ে দুই বিঘা করলায় খরচ পড়ে ৬৫ হাজার টাকা, আর বিক্রি হয় ৪৫ হাজার টাকার কম, তখন মুনাফা তো দূরের কথা, মূলধনই ফিরে আসে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বলছেন, ‘কৃষকের ক্ষতি হবে না’। কিন্তু হিসাব যাদের নিজের চোখে দেখা, তাদের কাছে এই বাণী শুধুই সান্ত্বনাবাক্য।
করলার মতো সবজির অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো, এটি হিমাগার ছাড়া মাত্র কয়েকদিন রাখার মতো। তাই চাষিকে সবজি নির্ধারিত সময়েই বাজারে নিতে হয়। আর তখনই পাইকাররা সুযোগ বুঝে দাম ঠিক করে দেয়।
সরকার ঘোষণা দিয়েছে দেশজুড়ে কয়েকশ’ হিমাগার তৈরি করা হবে, যাতে চাষিরা দাম পড়লে পণ্য সংরক্ষণ করে পরে উত্তম মূল্যে বিক্রি করতে পারেন। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগেই কতগুলো দিক খেয়াল রাখা দরকার। প্রথমত, এই হিমাগারগুলোকে কৃষকের নাগালে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংরক্ষণ খরচ কৃষকের সাধ্যের মধ্যে থাকতে হবে। তৃতীয়ত, হিমাগারগুলো বড় আড়তদার ছাড়াও প্রান্তিক চাষিরাও যাতে সহজে ব্যবহার করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু কয়েকশ’ হিমাগার তৈরি করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, এটা ভাবার কারণ নেই। প্রয়োজন একটি সুসংহত কোল্ড চেইন ব্যবস্থা, যা উৎপাদনক্ষেত্র থেকে শুরু হয়ে বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। সরকারের বিক্রয় ও বিপণন দপ্তরের সক্ষমতা এতটাই কম যে, তারা বাজারে কোনো প্রভাব রাখতে পারে না। ফলে সময় এসেছে কৃষিপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি শক্তিশালী, দক্ষ ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার।
একই সাথে সবজির জন্য জেলা পর্যায়ে অস্থায়ী সংগ্রহ কেন্দ্র চালু করা যেতে পারে, যেখানে সরকারি উদ্যোগে ন্যূনতম মূল্যে ক্রয় নিশ্চিত করা হবে। দরকার হলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ফড়িয়া ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও যেতে পারে।
এছাড়া হিমাগার নির্মাণের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা দরকার। যেমন করোলাসহ নানা সবজি দিয়ে আচার, চিপস বা শুকনা পাউডার উৎপাদন, যা দাম কমার সময় কৃষককে বিকল্প বাজার দেবে।
মনে রাখা দরকার, কৃষকই দেশের অন্নদাতা। কিন্তু সেই অন্নদাতা যখন নিজে বিপাকে পড়েন, তখন তা মঙ্গলের লক্ষণ নয়।