সম্পাদকীয়
জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিন’। ডা. শফিকুর রোববার খুলনায় আয়োজিত বিরোধী ১১ দলীয় ঐক্যের জনসভায় বক্তৃতাকালে এই হুংকার দেন।
ডা. শফিক বিপ্লব বলতে নিঃসন্দেহে ২০২৪ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানকে বুঝিয়েছেন। ওই গণঅভ্যুত্থান তৎকালীন ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করে; যেখানে জামায়াতে ইসলামী ও তার ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের বড় ভূমিকা ছিল।
প্রশ্ন হলো, জামায়াত কি কোনো বিপ্লবী দল, যে তারা বিপ্লবের জন্য মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে চাইছে? জামায়াত তার গঠনতন্ত্রের কোথাও নিজেদের ‘বিপ্লবী দল’ হিসেবে দাবি করেনি। বরং তারা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় প্রচলিত ভোটের রাজনীতির অংশীদার এবং মানুষের ম্যান্ডেট নিয়েই ক্ষমতায় যেতে চায় বলে হাজারো বার বলেছে। এমনকি নামের সাথে ‘ইসলাম’ শব্দটি থাকলেও তাদের শীর্ষ নেতা বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে বলেছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে দেশে শরিয়া আইন চালু করবেন না। এর সরল অর্থ এই দাঁড়ায় যে, বিপ্লবের হুংকার দেওয়া বা সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া ফাঁকা বুলি ছাড়া কিছ্ইু না।
জাতির ঘাড়ে সাড়ে ১৫ বছর ধরে চেপে থাকা ফ্যাসিবাদী ভূতকে দলমতনির্বিশেষে এই দেশের মানুষ উৎখাত করেছে। এরপর প্রায় দেড় বছর দেশ চালিয়েছে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন নির্দলীয় সরকার। তাদের অধীনে হওয়া নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি। ক্ষমতাসীন দলটি এখনও এমন কোনো অপকর্ম করেনি যে, তাকে উৎখাত করা ফরজ হয়ে পড়েছে।
তাহলে কেন জামায়াতের শীর্ষ নেতা ‘অনিবার্য বিপ্লবের’ কথা বলছেন? এটি কি শুধুই মাঠের রাজনীতির বয়ান, নাকি এই কথাকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে ধরতে হবে?
বাংলাদেশের ইতিহাসের পরতে পরতে জামায়াতকে নিয়ে যত বিতর্ক হয়েছে, অন্য কোনো দলকে নিয়ে ততটা হয়নি। যে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান। শুধু তা-ই নয়, তারা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল মুক্তিকামী মানুষের লড়াই ঠেকাতে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একাত্তরে তারা বিপ্লবী শক্তি নয়, প্রতিবিপ্লবী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তখন দলটি জনঘৃণার শীর্ষে পৌঁছে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশে এই দলটির রাজনীতিও নিষিদ্ধ হয়। পরে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর দলটিকে রাজনীতি করার সুযোগ দেন। এখন সেই জামায়াতই জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত দল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে বিপ্লবের হুংকার দিচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো সময় কাটিয়েছে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়। এখনও তা অব্যাহত আছে বললে ভুল হবে না। ড. ইউনূস সরকারের সময় প্রশাসনের সর্বপর্যায়ে সবচেয়ে বেশি সুবিধাজনক অবস্থান নিতে সক্ষম হয় ‘গুপ্ত জামায়াত’ নেতা-কর্মী অথবা দলটির অনুসারীরা। এখন বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনের শীর্ষে থাকা জামায়াত সমর্থিতদের ধীরে ধীরে সরিয়ে দিচ্ছে। ফলে তাদের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব খানিকটা কমেছে বলে মনে হয়।
অন্যদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছে। ফলে তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বেড়েছে। ফ্যাসিবাদী জমানায় তারা যেভাবে নিষ্পেশনের শিকার হয়েছিল, এখন সেই তুলনায় তারা কার্যত স্বর্গে বসবাস করছে। এমন সুসময়ে তাদের শীর্ষ নেতার বিপ্লবের হুংকার বেমানানই বটে।
জামায়াতের ক্ষমতাচর্চা আমরা এরশাদ ও খালেদা জিয়ার আমলেও দেখেছি। তখন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের দাপট ছিল। তারা কথা বলতো অস্ত্রের ভাষায়। বহু শিক্ষার্থী ও প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের ওপর তাদের ভয়াবহ নিপীড়ন সেই সময় ব্যাপক ভীতি সৃষ্টি করে। দেখা যায়, যেখানে তারা ক্ষমতাবান সেখানে তারা শুধু স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে না, ভিন্নমতকে একেবারেই সহ্য করে না; যা ফ্যাসিবাদী চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ।
সুতরাং একথা বলা যেতেই পারে, জামায়াতের বিপ্লবের হুংকার যদি আমলে নিতে হয়, তাহলে এই দেশে প্রতিবিপ্লবী তৎপরতার বাড়বাড়ন্ত হয়েছে বলেই ধরতে হবে। পশ্চাৎপদ চিন্তার এই দলটি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে নিতে পারলে দেশটাকে অন্ধকারে টেনে নিয়ে যাবে। দেশের মানুষ তা মেনে নেবে- একথা ভাবলে জামায়াত ভুল করবে, যেমনটি তারা ইতিহাসের পরতে পরতে করেছে।