সম্পাদকীয়
ঘৃণ্য অপরাধের বিচার যত দ্রুত হয়, ততই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়- সম্প্রতি ঝিনাইদহ ও রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দ্রুত রায় ঘোষণা মানুষকে এমন বার্তা দিয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই। দুটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনে সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছে। কিন্তু এই স্বস্তি যেন ক্ষণস্থায়ী না হয়, তার জন্য ভাবতে হবে গভীরভাবে। কারণ প্রতিবার শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো নৃশংস অপরাধ ঘটলে সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। আবার মামলার রায়ে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হলে মানুষ খানিকটা স্বস্তি পায়। কিন্তু পৈশাচিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি তো ঠেকানো যায় না। তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুধু শাস্তি নিশ্চিত করেই আমরা এমনটি ভাবতে পারি না যে, ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না। সেই কারণে ধর্ষকামিতা নির্মূলে এখন শাস্তির পাশাপাশি অন্যান্য পন্থাগুলোও গভীরভাবে ভাবা দরকার।
গত সপ্তাহে রামিসা হত্যা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল। এরপর সোমবার ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে সাড়ে চার বছরের শিশু তাবাচ্ছুম ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আবু তাহের (৩৩) নামে এক যুবককে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। নজিরবিহীন দ্রুততায় এসব মামলা ফয়সালা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’-এর ৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তার মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আর ধর্ষণের ফলে যদি ওই শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহলেও একই শাস্তির বিধান রয়েছে।
শুধু শাস্তির ভয়ে অপরাধ কমবে- এমনটাও নিশ্চিতরূপে ভাবা ঠিক হবে না। কারণ অপরাধীরা সাধারণত শাস্তির চেয়ে ধরা না পড়ার সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
এমতাবস্থায় শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধে শাস্তির পাশাপাশি আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এই ক্ষেত্রে জনসচেতনতা তৈরি করা সবচেয়ে জরুরি। আমাদের দেশে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা’ থাকলেও তা আইনে পরিণত হয়নি, যা একটি বড় ঘাটতি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ফওজিয়া করিমের মতে, ধর্ষকদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। তাদের মসজিদ, বাজার-ঘাটসহ সবকিছু থেকে প্রতিরোধ করতে হবে। এ ছাড়া পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে এ ব্যাপারে আরও সোচ্চার হতে হবে ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধীদের একটি প্রোফাইল তৈরি করে থাকে। প্রথমবারের অপরাধের রেকর্ড সংরক্ষণ করা, যাতে দ্বিতীয়বার অপরাধ করলে তা সহজেই শনাক্ত করা তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তারাও স্বীকার করেন যে, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক অপরাধ প্রতিরোধ করা তাদের পক্ষে খুবই কঠিন।
রামিসা ও তাবাচ্ছুমের মৃত্যুদণ্ডের রায় যেমন ন্যায়বিচারের প্রতীক, তেমনি এটি একটি অনুস্মারক যে শাস্তির চেয়ে প্রতিরোধ বেশি জরুরি। আইনের কঠোরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, আইনি সংস্কার ও কার্যকর মনিটরিং। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই দায়িত্ব। শাস্তি যেমন অপরাধীদের জন্য ভয় তৈরি করে, তেমনি প্রতিরোধের ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেন কেউ এমন জঘন্য অপরাধ করার কথা ভাবতেই না পারে। আজকের শিশুরা যেন নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে, সেটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।