প্রতিবছর সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে যশোরসহ সারা দেশে লাখ লাখ গাছের চারা রোপণ করা হয়। পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কথা বলে এসব কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয় বিপুল অর্থ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, রোপণ করা চারাগুলোর কী হয়? কতগুলো বেঁচে থাকে, কতগুলো মারা যায় এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়? সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন বলছে, এসব তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। গাছ যদি না-ই বাঁচে, তো বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় অবশ্যই।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যশোরের ভৈরব নদীর তীর, পুরাতন খয়েরতলা বাজার, ঝুমঝুমপুর বিসিক শিল্পনগরী- এসব স্থানে একসময় সামাজিক বন বিভাগের উদ্যোগে যে সবুজায়ন করা হয়েছিল, আজ সেখানে শুধু আগাছা, লতাপাতা ও ঝোপঝাড়। রোপণ করা গাছের কোনো চিহ্ন নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ তদারকি, পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একসময়কার সামাজিক বনায়নের গাছগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে গেছে। সরকারি অর্থ ব্যয়ে গড়ে তোলা এসব সবুজায়ন প্রকল্প এখন কার্যত অস্তিত্বহীন।
এবার যশোরে প্রায় দুই লাখ ১৮ হাজার গাছের চারা রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও বজ্রপাতের ঝুঁকি বিবেচনায় তালগাছ রোপণকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আগের বছরের রোপণ করা গাছগুলোর কী হয়েছে? তাদের টিকে থাকার হার কত? এই তথ্য না জানিয়ে প্রতিবছর নতুন করে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ কতটা যুক্তিসংগত?
পরিবেশবিদ ও সচেতন নাগরিকরা সঠিক প্রশ্নই তুলেছেন- শুধু গাছ লাগিয়ে ছবি তুলে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না। এটি শুধু সরকারি অর্থেরও অপচয়ের নামান্তর।
তাহলে আমরা কি গাছ লাগানো বন্ধ করে দেবো? নিশ্চয় নয়। দরকার হলো সময়োপযোগী পদক্ষেপ ও কার্যকর জবাবদিহিতা। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে ব্যয় হওয়া অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে চারার টিকে থাকার হার পর্যবেক্ষণে একটি স্বচ্ছ তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে। কোথায়, কতটি গাছ লাগানো হয়েছে এবং তার মধ্যে কতটি টিকে আছে- এর নিয়মিত হিসাব রাখতে হবে।
গাছগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও দায়িত্বশীল নাগরিকদের সম্পৃক্ত করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় এগোলে গাছ বাঁচার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যাবে। উন্নয়নের নামে পুরনো বড় গাছ কেটে ফেলার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। বৃক্ষরোপণের পর সেচ, আগাছা পরিষ্কার, সুরক্ষা বেষ্টনী নির্মাণ এবং নিয়মিত তদারকির জন্য পর্যাপ্ত জনবল ও বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। দিবস বা মৌসুমকেন্দ্রিক কর্মসূচি শেষ হলে যেন গাছগুলোর আর কোনো খোঁজ না থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করে চারা রোপণের সংখ্যার ওপর নয়, বরং সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার ওপর। পরিবেশ রক্ষায় পরিকল্পিত বনাঞ্চল তৈরি করতে হবে এবং তা দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। সরকারি অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে বৃক্ষরোপণ প্রকল্পে জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। গাছগুলো কোথায় যায়- এই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি কেবল কাগজে-কলমে সাফল্যের আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আর তা টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা।