সম্পাদকীয়
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির খবরটি ছোট কিন্তু উদ্বেগজনক। গত পাঁচ বছরে এই উপজেলায় প্রায় ১০০টি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে, অথচ একজন চোরও ধরা পড়েনি। উল্টো ভুক্তভোগী কৃষকদের কোটি টাকা জরিমানা দিতে হয়েছে। এই প্রক্রিয়া কৃষকের প্রতি চরম অবিচার ও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতাহীনতার চূড়ান্ত নিদর্শন।
ট্রান্সফরমার চুরি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ। এত বিপুল সংখ্যক ট্রান্সফরমার চুরি যাওয়ার অর্থ হলো, এক বা একাধিক সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যাদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্কও থাকতে পারে। কিন্তু পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ও থানা পুলিশের চক্ষুশূল হয়ে থাকা এই অপরাধের মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হওয়ার পেছনে অবশ্যই গাফিলতি বা অপারগতা রয়েছে। কেবল মামলা দায়ের করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; চোর শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি, সিসি ক্যামেরা স্থাপন, স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও চোরাই ট্রান্সফরমার বিক্রির পথ অনুসন্ধান- এই কাজগুলো করা হয়নি বলেই সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়।
বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ‘চুরি হওয়া ট্রান্সফরমারের মূল্য গ্রাহককেই দিতে হবে’- এই নিয়মটি চরম অন্যায়। গ্রাহক তো ট্রান্সফরমার চুরি করেননি, বরং তিনি বৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে ক্ষেতে সেচ দিয়েছেন। ট্রান্সফরমারটি পল্লী বিদ্যুৎ সম্পত্তি, তার নিরাপত্তা দেওয়া বিদ্যুৎ অফিসের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে যখন ট্রান্সফরমার চুরি যায়, তখন তার দায় কৃষকের কাঁধে চাপবে কেন? আবার জরিমান দেওয়ার পরও কৃষকদের সেচ পাম্প বন্ধ থাকে। এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।
তৃতীয়ত, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দেওয়া যায় না, যতক্ষণ না তার দোষ প্রমাণিত হয়। কিন্তু এখানে কৃষকদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, অথচ তাদের অর্থ আদায় করা হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে তাদের ‘অপরাধী’ ঘোষণার শামিল। প্রশ্ন হলো, ট্রান্সফরমার চুরির ক্ষতিপূরণ আদায়ের আগে কেন চোর শনাক্তে ব্যর্থতার জন্য কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হবে না?
এখন অপরাধী শনাক্ত ও ধরার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। ট্রান্সফরমারে জিপিএস ট্র্যাকার ও স্মার্ট লক বসালেই তো চুরির সঙ্গে সঙ্গেই অবস্থান শনাক্ত করা যায়। মামলাগুলো অবশ্যই পুলিশের সাইবার ইউনিটের মাধ্যমে তদন্ত করাতে হবে। বিদ্যুৎ অফিসের দায়িত্ব পালনে অক্ষমতার দায় সংশ্লিষ্টদেরই নিতে হবে। কৃষককে কোনোভাবেই দায়ী করা যাবে না। দ্রুততম সময়ের মধ্যে চোর ধরতে থানা ও বিদ্যুৎ অফিসের যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করা হোক। চোর ধরতে জনগণকে পুরস্কারের মাধ্যমে তথ্য দিতে উৎসাহিত করা হোক।
কৃষকরা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল চালিকাশক্তি। যারা দেশকে খাদ্য দেন, তাদের বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার চুরির কারণে শাস্তি দেওয়া বেদনাদায়ক। প্রশাসনের দায়িত্ব হলো অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া, আর কৃষককে সুরক্ষা ও সহায়তা দেওয়া। যদি প্রশাসন এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে কেবল ট্রান্সফরমার নয়, বরং জনবিশ্বাসও চুরি হবে।