তসলিম শিমুল
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষে প্রকাশিত ফিফার সর্বশেষ ব্যক্তিগত পাওয়ার র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছেন জার্মান ফরোয়ার্ড ডেনিজ উন্দাভ। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং চলতি আসরের গোল্ডেন বুট দৌড়ে শীর্ষে থাকা আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি রয়েছেন দ্বিতীয় স্থানে। আর পর্তুগিজ তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জায়গা পেয়েছেন ৭৯ নম্বরে।
গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে ৬ গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছেন মেসি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯, যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে গোলের পরিসংখ্যানে এগিয়ে থাকলেও ফিফার পাওয়ার র্যাঙ্কিংয়ে তাকে ছাড়িয়ে গেছেন উন্দাভ।
ফিফা আউটফিল্ড খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করেছে তিনটি সূচকে- আক্রমণ, সৃজনশীলতা ও রক্ষণভাগ। প্রতিটি বিভাগে ১০-এর মধ্যে নম্বর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই র্যাঙ্কিং।
শীর্ষে থাকা ডেনিজ উন্দাভ আক্রমণে পেয়েছেন ৮.৩৬, সৃজনশীলতায় ৬.৭৮ এবং রক্ষণে ৪.৭০। দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেসির স্কোর যথাক্রমে ৮.৩৪, ৬.৪৩ ও ৫.১৪। তৃতীয় স্থানে থাকা কিলিয়ান এমবাপ্পের স্কোর ৮.১৩, ৭.২৫ ও ৪.৫৯। চতুর্থ স্থানে থাকা ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের স্কোর ৭.৯২, ৬.৩৯ ও ৪.৭৫।
তালিকার সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো, প্রথম দিকে জায়গা হয়নি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর। আক্রমণে ৫.৭২, সৃজনশীলতায় ৪.৯৮ এবং রক্ষণে ৪.৭৪ স্কোর নিয়ে তিনি অবস্থান করছেন ৭৯ নম্বরে। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচে দুটি গোল করলেও নিজের স্বাভাবিক ছন্দে দেখা যায়নি এই পর্তুগিজ অধিনায়ককে। তবে নকআউট পর্বে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকবে তার সামনে।
এবারের বিশ্বকাপে জার্মানির হয়ে সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি ডেনিজ উন্দাভ। বদলি হিসেবে নেমেই তিন গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করে নজর কাড়েন ২৯ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার। যদিও রাউন্ড অব ৩২-এ টাইব্রেকারে প্যারাগুয়ের কাছে হেরে জার্মানির বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে গেছে, তবু ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন আলোচনার কেন্দ্রে।
উন্দাভের ফুটবলজীবনও সংগ্রামমুখর। মাত্র ১৪ বছর বয়সে উচ্চতা কম হওয়ায় তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল জার্মান ক্লাব ওয়ার্ডার ব্রেমেন। ১৭ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে যোগ দেন চতুর্থ বিভাগের ক্লাব টিএসভি হ্যাভেলসেতে। সেখানে অল্প আয়ে জীবন চালাতে একটি কারখানায় প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজ করতেন। সেই কঠিন সময়েও ফুটবল ছাড়েননি।
পরে ২৩ বছর বয়সে প্রথম পেশাদার চুক্তি পান ইউনিয়ন সেন্ট-গিলোয়েজে। এরপর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ব্রাইটন অ্যান্ড হোভ অ্যালবিয়ন হয়ে ভিএফবি স্টুটগার্টে যোগ দেন। ২০২৫ মৌসুমে স্টুটগার্টের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই তাকে বিশ্বকাপ দলে জায়গা এনে দেয়।
অতীত স্মরণ করে উন্দাভ বলেন, ‘উচ্চতার কারণে ব্রেমেন আমাকে বাদ দেওয়ার পর ভীষণ ভেঙে পড়েছিলাম। কিন্তু কখনো আশা ছাড়িনি। ১৭ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়েছিলাম। প্রতিদিন আট ঘণ্টা কারখানায় কাজ করার পরও অনুশীলন চালিয়ে গেছি। ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতাম, এরপর সরাসরি মাঠে গিয়ে অনুশীলন করতাম।’
কুর্দি-ইয়াজিদি বংশোদ্ভূত উন্দাভ আরও বলেন, ‘আমার বাবা-মা আমাকে যেভাবে দেখেন, সেটি আমার সবচেয়ে বড় গর্ব। আমাদের সম্প্রদায় থেকেও একজন বিশ্বমঞ্চে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে পেরেছে।’
বর্তমানে সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খিরবেত আল-গাজাল গ্রামে ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসে জার্মানির ম্যাচ উপভোগ করেন। উন্দাভের সাফল্য তাই শুধু ব্যক্তিগত নয়, তার পুরো সম্প্রদায়ের জন্যও গর্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে।