সম্পাদকীয়
নড়াইলের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী যুবক আনোয়ার হোসেনের মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের ‘সভ্য সমাজের’ গালে আরেকটি চপেটাঘাত। চোর সন্দেহেই হোক বা অন্য কোনো অপবাদ দিয়ে- কোনো মানুষকে গাছে বেঁধে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে, গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধের চেষ্টা করা এবং সারারাত বর্বর নির্যাতনের পর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া- এটি কোনো আইন নয়, এটি পশুত্বের বহিঃপ্রকাশ।
সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আনোয়ার হোসেন মানসিক প্রতিবন্ধী ছিলেন। তিনি প্রায়ই মনের খেয়ালে ঘুরে বেড়াতেন। সেই সুযোগেই তাকে ‘চোর’ সাব্যস্ত করে স্থানীয় কয়েক যুবক ‘নিজ হাতে বিচার’ করেছে। চোর সন্দেহ হলে কর্তব্য হলো পুলিশে খবর দেওয়া, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। নিজেরা লাঠি-রড হাতে তুলে নিয়ে পিটিয়ে মারা পাশবিকতার প্রকাশ। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনও আইন নিজ হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে রয়ে গেছে।
একজনকে পিটিয়ে মারা হয়েছে শুধু এই অপরাধে যে, তিনি ‘সন্দেহভাজন’ ছিলেন। যদি অপরাধ প্রমাণিত হতোও, তাহলেও তাকে এভাবে হত্যা করা বাংলাদেশের আইনপরিপন্থি।
হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি প্রতিবন্ধী ছিলেন বলে হয়তো কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি। নির্যাতনকারীরা দুর্বলকে শনাক্ত করে তার ওপর নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। এটি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আইন আমাদের বলে, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, আটক বা শাস্তি দেওয়ার একমাত্র অধিকার রাষ্ট্রের। সেই অধিকার কখনোই সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। ‘চোর সাব্যস্ত’ করার অর্থ এই নয় যে, কেউ নিজেই রায় কার্যকর করতে পারেন। এই ঘটনায় অভিযুক্ত প্রসেনজিৎ, সৌরভ, অপূর্ব, আকাশ ও হৃদয় যদি সত্যিই আনোয়ারকে চোর মনে করতেন, তাদের উচিত ছিল পুলিশে অভিযোগ করা।
এই ঘটনায় অভিযুক্ত একজনকে পুলিশ ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে। আমরা পুলিশকে ধন্যবাদ জানাই। তবে শুধু গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয়; এই মামলার বিচার যেন দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং অপরাধীরা যেন তাদের কর্মের যথাযথ শাস্তি পায়। জনমনে যেন এই বার্তাটি পৌঁছায় যে, আইন নিজের হাতে তুলে নিলে শাস্তি অনিবার্য।
তবে শুধু বিচার দিয়েই এই ধরনের ঘটনা হ্রাস করা যাবে না। আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে আইনি সচেতনতা বাড়াতে হবে। জনপদে এখনও ‘অপরাধী’ সন্দেহে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা থেকে মানুষকে নিবৃত্ত করতে গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
আমাদের সমাজে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের সুরক্ষায় পরিবার, প্রতিবেশী ও স্থানীয় প্রশাসনের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যদি অস্বাভাবিক আচরণ করেন বা স্থানীয় কারও কাছে সন্দেহজনক মনে হন, সেক্ষেত্রে সহানুভূতি ও ধৈর্য দেখানো নাগরিক কর্তব্য। কারণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেক সময় নিজেদের অবস্থান বুঝিয়ে বলতে পারেন না। তাই তাদের প্রতি বর্বরতা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।