সম্পাদকীয়
পদ্মাসেতু রেল সংযোগের কল্যাণে যশোর থেকে ঢাকার যাত্রা এখন মাত্র আড়াই ঘণ্টা থেকে পৌনে তিন ঘণ্টার। কিন্তু নতুন এই রেলপথের পূর্ণ সুফল থেকে এখনও বঞ্চিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখো মানুষ। সময়োপযোগী ট্রেনের অভাবে প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না।
রেলপথ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দ্রুত ও সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত করা। প্রকল্পটির নাম ‘ঢাকা-যশোর পদ্মাসেতু রেল লিংক’। কিন্তু এই প্রকল্প সম্পন্ন করে ট্রেন চালু করার সময়ই বঞ্চিত করা হয় যশোরকে।
২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ‘রূপসী বাংলা আন্তঃনগর এক্সপ্রেস’ চালু হলেও যশোর জংশন থেকে বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে যাওয়া এই ট্রেন ঢাকায় পৌঁছায় রাতে। ফলে দিনের কাজ শেষ করে একই দিনে ফিরে আসা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদককে তন্ময় ইসলাম জয় বলছেন, ‘খুলনার মানুষ প্রভাতি ট্রেনের সুবিধা পেলেও আমাদের ট্রেন বিকেলে হওয়ায় রাতে ঢাকা পৌঁছে হোটেল ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ দুটোই অপচয় হচ্ছে।’ তার এই বক্তব্যই আসলে যশোর অঞ্চলের সাধারণ যাত্রীদের কথা।
প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পে দিনে মাত্র একটি ট্রেন দুইবার চলাচল করায় বিশেষজ্ঞরা রাষ্ট্রীয় অর্থের চরম অপচয় দেখছেন। তারা মনে করছেন, এই রুটে ট্রিপ বাড়ালে বাংলাদেশ রেলওয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হবে। রেল যোগাযোগ নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ সড়কপথের চেয়ে অনেক কম। সেকারণে দরকারি সুবিধা পেলে মানুষ ট্রেনে যাতায়াত করতেই সাচ্ছন্দবোধ করে। তবে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখিত প্রতিদিন ২৪ জোড়া ট্রেনের সক্ষমতার তুলনায় এখন সাকল্যে চলছে মাত্র দশটি যাত্রীবাহী ট্রেন; মালবাহী কোনো ট্রেনই চলছে না।
বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি এ অবস্থার প্রতিবাদে ছয় দফা দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রভাতি আন্তঃনগর ট্রেনসহ তিনটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু, সব আন্তঃনগর ট্রেনে সাধারণ বগি বৃদ্ধি, দর্শনা-খুলনা ও বেনাপোল-যশোর রুটে ডাবল রেললাইন নির্মাণ এবং কমিউটার ট্রেন চালু। ২০২৩ সাল থেকে স্মারকলিপি, মানববন্ধন ও রেল অবরোধের মাধ্যমে দাবি জানিয়ে আসা সংগঠনটি গত ৩০ জুনের মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এই সম্পাদকীয় লেখার সময়ও সংগঠনটির ব্যানারে যশোর রেলজংশনে অবস্থান কর্মসূচি চলছিল; যে কর্মসূচিতে সব মত-পথের মানুষ অংশ নেন।
সংগঠনের সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার রুহুল আমিন বলেন, ‘দীর্ঘ আন্দোলনের পর আমরা মাত্র একটি ট্রেন পেয়েছি, তাও বিকালে যাওয়ার কারণে যশোরবাসীর উপকারে আসে না। সরকার আমাদের দাবি বাস্তবায়ন না করলে কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবো।’
যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আন্দোলনকারীদের প্রতি একাত্মতা জানিয়ে রেল মন্ত্রণালয়ে আরও ট্রেন চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘যশোর একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলজংশন। আমরা সরকারের কাছে সব দাবি তুলে ধরেছি এবং রেলমন্ত্রী শিগগির এখানে আসবেন বলে আশা করছি।’
পদ্মাসেতু রেল সংযোগ যাত্রার সময় কমিয়েছে ঠিকই, কিন্তু যাত্রীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হয়নি। ভোরে ঢাকামুখী এবং সন্ধ্যায় যশোরমুখী একটি আন্তঃনগর ট্রেনের দাবি এ অঞ্চলের মানুষের কাছে এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি যুগান্তকারী প্রকল্প যদি জনগণের দোরগোড়ায় পূর্ণ সুবিধা পৌঁছে দিতে না পারে, তবে সেই প্রকল্প সার্থক নয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখো মানুষের এই বৈধ দাবি সরকারের কর্ণগোচর হলে সময়োপযোগী ট্রেন চালুর মাধ্যমে পদ্মাসেতু রেল প্রকল্প তার প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে।