‘পুশ ইন’ ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি ও সতর্কতা বাড়ানোর কথা বারবার বলছে বাংলাদেশ সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত জানিয়েছেন, বিজিবি ‘সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায়’ আছে। কিন্তু এর মধ্যেও থামেনি বিএসএফের হত্যাযজ্ঞ।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বিএসএফের হাতে দশ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। যার সাতজনই মারা গেছেন গুলিতে।
একথা আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক যে পর্যায়েই থাকুক না কেন, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কখনও সীমান্তে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করেনি। যখন দিল্লির অনুগত শাসকগোষ্ঠী এই দেশ শাসন করেছে, তখনও তাদের হাতে বিস্তর বাংলাদেশি খুন হয়েছেন। ভারতের সঙ্গে বেশ কয়েকটি দেশের সীমানা রয়েছে। কিন্তু দেশটির সীমান্ত রক্ষী বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায় কার্যত শুধু বাংলাদেশে। চীন সীমান্তে তারা ‘সুবোধ বালক’ হয়ে যায়। কারণ সেখানে পাল্টা আঘাত আসে ভয়ানকভাবে। প্রায় একই অবস্থা পাকিস্তান সীমান্তেও। ভারতীয় বাহিনী যেক’বার পাকিস্তানের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করেছে, সেই ক’বারই মার খেয়ে পিছু হটেছে। ওই দুই সীমান্ত সমতল নয়, পাহাড়-পর্বতে ঘেরা। সেখানে প্রতিপক্ষের সমরপ্রস্তুতিও বিশাল।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ভৌগোলিক বাস্তবতা ভিন্ন। চার হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এই সীমান্তের প্রতিটি ইঞ্চিতে সমান নজরদারি প্রায় অসম্ভব। টহলের ফাঁক গলে মানুষজন সীমান্ত পাড়ি দেয়- কেউ আত্মীয়ের বাড়ি, কেউ গবাদিপশু আনতে, কেউ চোরাচালানের উদ্দেশ্যে।
আগের বছরগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের একই সময়ে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৫। ২০২৪ সালে ১৪ এবং ২০২৩ সালে ১১ জন নিহত হন বিএসএফের হাতে। ২০২০ সালের প্রথমার্ধে তো মৃতের সংখ্যা ছিল ২৬। ২০২৫ সাল তো গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ছিল। ওই বছর বিএসএফের গুলিতে ৩২ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
সীমান্তের এই প্রাণহানি কেবল ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি আরও গভীর সমস্যা, যার মূলে আছে ভারতের ‘শ্যুট-অন-সাইট’ নীতি এবং সীমান্তের ওপারে পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। বিজেপি সরকার ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তার প্রভাব পড়ছে সীমান্তের এই মৃত্যুর মিছিলে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি মৃত্যুই একটি পরিবারের অপরিমেয় ক্ষতি। সেকারণে এই হত্যাকাণ্ডের স্থায়ী সমাধান দরকার। এর জন্য প্রয়োজন দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা, বিএসএফের গুলি চালানোর নীতি পুনর্বিবেচনা এবং সীমান্তবর্তী মানুষের চলাচলের মানবিক দিকটি বিবেচনায় আনা। ঘোষিত ‘সতর্কতা’ যেন নামমাত্র না থাকে, প্রাণহানি যেন থামে, সেদিকেই নজর দিতে হবে এখন।
সীমান্তে মানুষকে গুলি করে হত্যার আগে সতর্কবার্তা দেওয়ার বিধান গোটা দুনিয়ায় চর্চিত হয়। ইসরায়েলের মতো বর্বর রাষ্ট্র এই বিধান মানে না। আর মানে না ভারত, বিশেষত বাংলাদেশ সীমান্তে। দেশটির এই মানবতাবিরোধী তৎপরতা যেকোনো মূল্যে থামাতে হবে। দরকার হলে আন্তর্জাতিক দরবারে বিষয়টি নিয়ে যেতে হবে। এবং তার সঠিক সময় এখনই।