যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

স্মরণ

সুরসম্রাজ্ঞী আশা ভোঁসলে

সীমান্ত বসু

প্রকাশ : বুধবার, ২২ এপ্রিল,২০২৬, ০৩:৫২ পিএম
সুরসম্রাজ্ঞী আশা ভোঁসলে

১২ এপ্রিল ২০২৬, ভারতীয় সঙ্গীতের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটেছে। ৯২ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন ভারতের অন্যতম কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে। আট দশকেরও বেশি সময় ধরে তার জাদুকরী কণ্ঠস্বর কোটি কোটি শ্রোতার হৃদয় জয় করেছে। ‘প্রয়াত’ শব্দটি তার নামের আগে বসলেও, সৃষ্টিকর্ম তাকে চির অমর করে রাখবে।

আশা ভোঁসলের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাঙ্গলির এক ছোট্ট গ্রামে গোমন্তক মারাঠা সমাজ পরিবারে। তার বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন একজন বিখ্যাত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী এবং থিয়েটার অভিনেতা। ছোটবেলা থেকেই সাঙ্গীতিক আবহে তার বেড়ে ওঠা। তার দিদি ছিলেন আরেক কিংবদন্তি গায়িকা লতা মঙ্গেশকর।

বাবার অকাল প্রয়াণের পর চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ে তাদের পরিবার পুনে থেকে মুম্বই (তৎকালীন বোম্বে) পাড়ি দেয়। সংসার চালানোর তাগিদে লতা এবং আশা খুব ছোট বয়সেই গান গাওয়া ও সিনেমায় অভিনয় শুরু করেন। মাত্র দশ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি ‘মাঝা বাল’-এ ‘চলা চলা নব বালা’ গানটি গাওয়ার মাধ্যমে তার প্লেব্যাক ক্যারিয়ারের সূচনা হয়।

আশা ভোঁসলের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন ছিল চরম সংগ্রামমুখর। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে তিনি দিদি লতার ৩১ বছর বয়সী সেক্রেটারি গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে সুখের হয়নি। ১৯৬০ সালে তিন সন্তান বর্ষা ভোঁসলে, হেমন্ত ভোঁসলে ও আনন্দ ভোঁসলেকে নিয়ে তিনি স্বামীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন এবং একাকী জীবনসংগ্রাম শুরু করেন।

১৯৫০-এর দশকের শুরুতে বলিউডে শমশাদ বেগম, গীতা দত্ত এবং লতা মঙ্গেশকরের মতো শিল্পীদের একচেটিয়া রাজত্ব ছিল। প্রথম দিকে আশা কেবল সেইসব গান গাওয়ার সুযোগ পেতেন যা অন্যান্য শীর্ষ গায়িকারা প্রত্যাখ্যান করতেন, বিশেষ করে ভ্যাম্প বা ক্যাবারে ড্যান্সারদের জন্য তৈরি গান। কিন্তু ১৯৫৭ সালে বিআর চোপড়ার ‘নয়া কৌর’ ছবিতে সুরকার ওপি নায়ার তাকে দিয়ে গান গাইয়েছিলেন। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

আশা ভোঁসলেকে বলা হয় ভারতীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে বহুমুখী গায়িকা। ওপি নায়ারের সুরে গাওয়া গানগুলো তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। এরপর সুরকার শচীন দেববর্মণ এবং বিশেষ করে রাহুল দেববর্মনের সাথে তার জুটি ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতে এক নতুন যুগের সূচনা করে। হেলেনের ঠোঁটে তার গাওয়া ক্যাবারে গান ‘পিয়া তু অব তো আজা’, ‘ইয়ে মেরা দিল’, বা ‘ও হাসিনা জুলফোওয়ালি’ আজও সমান জনপ্রিয়। ‘উমরাও জান’ (১৯৮১) ছবিতে খৈয়ামের সুরে তার গাওয়া গজল ‘ইন আঁখো কি মাস্তি’ বা ‘দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়’ প্রমাণ করে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতেও তার অনায়াস বিচরণ। এই ছবির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

বাঙালি শ্রোতাদের কাছে আশা ভোঁসলের এক বিশেষ স্থান রয়েছে। আরডি বর্মণ, সলিল চৌধুরী, নচিকেতা ঘোষ এবং সুধীন দাশগুপ্তের মতো সুরকারদের সুরে তিনি অসংখ্য কালজয়ী বাংলা গান গেয়েছেন। ‘মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো’, ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’, ‘সন্ধ্যাবেলায় তুমি আমি’, বা ‘যেতে দাও আমায় ডেকো না’-র মতো গান আজও বাঙালির নস্টালজিয়া। আরডি বর্মণ-আশা জুটির পুজোবার্ষিকীর গানগুলো বাঙালির শারদোৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

১৯৮০ সালে তিনি বিখ্যাত সুরকার রাহুল দেববর্মণকে বিয়ে করেন। ১৯৯৪ সালে আরডি বর্মণের মৃত্যুর পর তিনি গভীর শোকে ডুবে যান। ব্যক্তিগত জীবনে বড় মেয়ে বর্ষা এবং বড় ছেলে হেমন্তের মৃত্যু তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করলেও তিনি গান ছাড়েননি। ছোট ছেলে আনন্দ ভোঁসলে শেষ দিন পর্যন্ত মায়ের পাশে ছিলেন ছায়ার মতো।

১৯৯০-এর দশকে পপ মিউজিকের জগতেও তিনি রাজত্ব করেন। ‘জানেমান জানেমান’, ‘রাহুল অ্যান্ড আই’, ‘জানম সমঝা করো’-র মতো অ্যালবামগুলো তরুণ প্রজন্মের কাছে তাকে নতুন করে জনপ্রিয় করে তোলে।

আশা ভোঁসলে তার আট দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ১২ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করেছেন। তিনি অন্তত ২০টি ভাষায় গান গেয়েছেন। সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালে ভারত সরকার তাকে ভারতীয় সিনেমার সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’ প্রদান করে। ২০০৮ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’-এ ভূষিত হন তিনি।

২০১১ সালে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাকে মিউজিক ইতিহাসে সর্বাধিক রেকর্ডকৃত শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

১২ এপ্রিল, ২০২৬, বুকে সংক্রমণ এবং মাল্টি-অর্গ্যান ফেইলিওরের কারণে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে এই সুরসম্রাজ্ঞী শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার প্রয়াণ উপমহাদেশের সঙ্গীত জগতে এমন এক শূন্যতার সৃষ্টি করেছে যা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। তবে আশা ভোঁসলে কেবল একজন গায়িকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রাণশক্তির এক জ্বলন্ত উদাহরণ। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত থেকে পপ, ভজন থেকে গজল, কিংবা রোম্যান্টিক থেকে ক্যাবারে- সব জায়গাতেই তার অবাধ বিচরণ ছিল। তার নশ্বর দেহের অবসান ঘটলেও, রেখে যাওয়া হাজারো সুরের মূর্ছনায় তিনি সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

লেখক: যশোর শহরের পূর্ব বারান্দীপাড়া এলাকার বাসিন্দা; রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)