মেহেরপুর প্রতিনিধি
মেহেরপুরে মাটির নিচ থেকে ৯০টি মাইন উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনীর বোমা ও মাইন ডিসপোজাল ইউনিট
ছবি:
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বেতবাড়িয়া গ্রামের একটি পরিত্যক্ত জমির মাটির নিচ থেকে ৯০টি মাইন উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনীর বোমা ও মাইন ডিসপোজাল ইউনিট।
এর মধ্যে ১৭টি এন্টি-ট্যাংক ল্যান্ডমাইন এবং ৭৩টি এন্টিপার্সনেল মাইন। প্রায় এক ঘণ্টার অভিযানে মাইনগুলো উদ্ধারের পর নিরাপদ স্থানে নিয়ে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) বেলা ৩টার দিকে যশোরের ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের ১৯ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল বেতবাড়িয়া গ্রামে অভিযান শুরু করে। মেজর তারিকের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বিশেষজ্ঞরা মাটির নিচ থেকে মাইনগুলো উদ্ধার করেন।
পরে বেতবাড়িয়া গুচ্ছগ্রামের মাঠে সেগুলো ধ্বংস করা হয়। নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের বিকট শব্দে আশপাশের এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
দুর্ঘটনা এড়াতে পুরো অভিযান ও বিস্ফোরক ধ্বংসের সময় ঘটনাস্থল ঘিরে রাখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাধারণ মানুষকে ঘটনাস্থলের আশপাশে যেতে দেওয়া হয়নি।
মাটির ওপর মাইনসদৃশ বস্তু, এরপর অভিযান
স্থানীয়রা জানান, বেতবাড়িয়া গ্রামের কালু মালিথার একটি পরিত্যক্ত জমিতে মাটির ওপর মাইনসদৃশ কয়েকটি বস্তু দেখতে পান তারা। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে যশোর সেনানিবাসের বোমা ও মাইন ডিসপোজাল ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে গিয়ে বস্তুগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। এরপর শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে মাটির নিচ থেকে ৯০টি মাইন উদ্ধার করা হয়।
একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক মাইন উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে এখন প্রশ্ন উঠেছে—কীভাবে এত বিপুলসংখ্যক মাইন ওই জমিতে এলো এবং কত বছর ধরে সেগুলো মাটির নিচে ছিল?

মুক্তিযুদ্ধের সময় পোঁতা হয়েছিল?
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মুক্তিযুদ্ধের সময় বেতবাড়িয়া গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প ছিল। একই সময়ে মাথাভাঙা নদীর ওপারে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ব্যাংগাড়ি এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ক্যাম্প ছিল।
ওই সময়ের সামরিক সংঘাতের অংশ হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনী এসব মাইন পুঁতে রাখতে পারে বলে ধারণা তাদের।
তবে এসব মাইন মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কি না, কিংবা কারা ও কী উদ্দেশ্যে এগুলো সেখানে পুঁতে রেখেছিল—এ বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি বা বিশেষজ্ঞ সূত্র থেকে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। মাইনগুলোর বয়স ও উৎস নির্ধারণে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
গাংনী থানার ওসি (তদন্ত) শিমুল কুমার দাস বলেন, উদ্ধার হওয়া বস্তুগুলো অত্যন্ত বিধ্বংসী মাইন। এগুলোর প্রকৃত উৎস ও বয়স জানতে বিশেষজ্ঞরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।
আরও মাইন থাকার শঙ্কা
বেতবাড়িয়ার মতো সীমান্তবর্তী ও মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মাটির নিচে এ ধরনের আরও বিস্ফোরক পড়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, এ ধরনের পুরোনো পরিত্যক্ত জমি ও সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান চালানো দরকার।
স্থানীয়রা আরও বলছেন, মাটির নিচে বা পরিত্যক্ত স্থানে মাইনসদৃশ কোনো বস্তু পাওয়া গেলে সেটি স্পর্শ, সরানো বা পরীক্ষা করার চেষ্টা করা উচিত নয়। এ ধরনের বস্তু দেখা গেলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
একসঙ্গে ৯০টি মাইন উদ্ধারের ঘটনায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো গেলেও এখন সামনে এসেছে আরও কয়েকটি প্রশ্ন—এসব মাইনের উৎস কোথায়, কত পুরোনো এবং বেতবাড়িয়ার মাটির নিচে আরও বিস্ফোরক আছে কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে এলাকাবাসী।