এম জুবায়ের মাহমুদ (শ্যামনগর) সাতক্ষীরা
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ খুলছে সুন্দরবন। দীর্ঘ বিরতির পর বনে যাচ্ছেন জেলে-বাওয়ালিরা। একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্যও উন্মুক্ত হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এতে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে কর্মচাঞ্চল্য। জেলে-বাওয়ালি, পর্যটন ব্যবসায়ী, নৌযান মালিক, হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন আশাবাদ।
বন খোলার অপেক্ষায় গত কয়েক দিন ধরে নৌকা, জাল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত করেছেন জেলেরা। আজ থেকে তারা সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া আহরণে নামবেন। তিন মাস আয় বন্ধ থাকায় অনেকেই ধার-দেনা করে সংসার চালিয়েছেন। তাই বন খুলতেই মাছ-কাঁকড়া ধরে সেই ঋণ শোধের আশা তাদের।
বুড়িগোয়ালিনীর দাঁতিনাখালী গ্রামের জেলে শফিকুল ইসলাম বলেন, তিন মাস বনে যেতে পারিনি। সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়েছে। এখন আবার বনে যেতে পারব। আশা করছি মাছ-কাঁকড়া ধরে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি ঋণও শোধ করতে পারব।
গাবুরার জেলে লিয়াকাত হোসেন বলেন, নৌকা-জাল সব প্রস্তুত। এখন শুধু বনে যাওয়ার অপেক্ষা। তবে আগের মতো মাছ-কাঁকড়া পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে।
সুন্দরবন খুলে যাওয়ায় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও আশাবাদী। মুন্সীগঞ্জের পর্যটনবাহী ট্রলার ব্যবসায়ী রেজাউল ইসলাম বলেন, তিন মাস পর্যটক না থাকায় ব্যবসা প্রায় বন্ধ ছিল। এখন পর্যটক বাড়লে হোটেল, রেস্তোরাঁ, ট্রলার ও নৌযান ব্যবসা আবার সচল হবে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছর সাতক্ষীরা রেঞ্জে মোট ২ হাজার ৯৩৮টি বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) রয়েছে। এর মধ্যে মাছ আহরণের জন্য ১ হাজার ১৪৮টি, কাঁকড়ার জন্য ১ হাজার ৭০০টি, গোলপাতার জন্য ২টি, পর্যটকবাহী ট্রলারের ৭৪টি, লবণ পানির ১টি এবং মধু আহরণের জন্য ১২টি বিএলসি রয়েছে। এ ছাড়া মাছ ও কাঁকড়া আহরণের জন্য আরও ৫০০টি ডিঙি নৌকা অনুমতি নিয়েছে বলে বন বিভাগ জানিয়েছে।
তবে নিষেধাজ্ঞার সময়েও অবৈধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ ঠেকাতে অভিযান চালিয়েছে বন বিভাগ। বন বিভাগ সূত্র জানায়, গত তিন মাসে অবৈধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশের অভিযোগে ৫৫টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় ৫৫টি নৌকা জব্দ এবং ৪৪ জনকে আসামি করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে ৩ হাজার ৮৫০ কেজি শামুক, একটি পিকআপ, ১ হাজার কেজি মধু, ২৩০ কেজি সাদা মাছ, ১৩৫ কেজি চিংড়ি মাছ, চার বোতল বিষ এবং হরিণ শিকারে ব্যবহৃত ২৭৮টি ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা মাছ, মধুসহ পচনশীল আলামত আদালতের নির্দেশনায় নিলামে বিক্রি করা হয়েছে।
তবে বন খোলার আনন্দের মধ্যেও জেলে-বাওয়ালিদের বড় উদ্বেগ বনদস্যু আতঙ্ক। চলতি বছরও সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে একাধিক অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারিতে `ডন বাহিনী' পরিচয়ে ১৯ জেলেকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে। এছাড়া মে মাসে আট এবং জুনের শুরুতে আরও ছয় জেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করার অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় বনজীবীদের মধ্যে এখনও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।
বনজীবীদের দাবি, সুন্দরবনের নদী-খালে নিয়মিত যৌথ টহল, বনদস্যু দমনে বিশেষ অভিযান এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তারা নিরাপদে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।
বন বিভাগের তথ্যমতে, মাছের প্রজনন ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রতি বছর জুন, জুলাই ও আগস্ট এই তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ এবং মাছ-কাঁকড়া আহরণ নিষিদ্ধ থাকে। গত ১ জুন থেকে কার্যকর হওয়া সেই নিষেধাজ্ঞা আজ থেকে প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মশিউর রহমান বলেন, `১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ফরেস্ট স্টেশনগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বনজ সম্পদ রক্ষা এবং বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে টহল ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে।'
তিন মাসের বিরতির পর আজ আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে সুন্দরবন। বনজীবীরা ফিরছেন জীবিকার সন্ধানে, পর্যটকেরা ফিরছেন প্রকৃতির টানে। তবে বনজীবীদের প্রত্যাশা, জীবিকার পাশাপাশি এবার যেন নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও মেলে।