যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

বিশ্বাস-সততায় চলছে দোকানিবিহীন টি স্টল

আব্দুল্লাহ আল মাসুদ

, ঝিনাইদহ

প্রকাশ : বুধবার, ১৯ আগস্ট,২০২৬, ১১:০০ এ এম
বিশ্বাস-সততায় চলছে দোকানিবিহীন টি স্টল

দোকানি নেই, কিন্তু খদ্দেররা ফিরে যায় না। কারো এক কাপ চা পানের দরকার, তিনি নিজেই বানিয়ে নিচ্ছেন। আবার চলে যাওয়ার সময় খরচের টাকা-পয়সা হিসেব কষেই ক্যাশে রেখে যাচ্ছেন। আর টাকা না থাকলে পরে এসে দিয়ে যান।

এটি বাইরের কোনো দেশের কথা নয়, বলছি ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার চারাতলা বাজারের গল্প। বাইরের যে কেউ সেখানে গেলে চোখে পড়বে ব্যতিক্রমী এই চায়ের দোকানটি।

চারাতলা বাজারের রয়েছে শমসের আলী নামে এক ব্যক্তি একটি ছোটখাট চায়ের দোকান। শমসের আলী পাশের ভালকি গ্রামের মুরাদ মণ্ডলের ছেলে।

সরেজমিনে দেখা যায়, দোকানের ঝাঁপ খোলা। সামনে সাজানো চা, বিস্কুট, পান, কেকসহ নানা শুকনো খাবার। পাশে চুলার উপরে পানির কেটলি আর প্রয়োজনীয় সবকিছু। কিন্তু দোকানি নেই।

একজন চা বানাচ্ছেন, কয়েকজন অপেক্ষা করছেন। প্রথমে হয়তো ভাববেন, মানুষটা শমসের। কিন্তু না লোকটার নাম হারুন অর রশিদ (৬৫)। তিনি সেখানে চা পান করতে এসেছেন। শুধু তিনি নেবেন না, তা নয়, দোকানে বসে থাকাদের জন্যেও তৈরি করছেন।

হারুন অর রশিদ নিজে একজন ক্রেতা। চা তৈরি শেষে সবাই মিলে বসে গল্প করছেন। খাওয়া শেষে যার যতো টাকা বিল, সে অনুযায়ী টাকা রেখে চলে যাচ্ছেন।
এই গল্প একদিন-দুইদিনের নয়, টানা চার বছর ধরে চলছে।

এখানে কেউ এসে নিজের হাতে চা বানিয়ে খান। কেউ কেক বিস্কুট নিয়ে খেয়ে তার দাম হিসাব করে দোকানের ক্যাশে রেখে যান। কারও কাছে ওই মুহূর্তে টাকা না থাকলে পরে এসে দিয়ে যান। কেউ নিজের চা বানানোর পাশাপাশি পাশে বসে থাকা অন্যজনের জন্যও চা বানিয়ে দেন।

পায়রাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা হারুন অর রশিদ প্রতিদিনই চারাতলা বাজারে আসেন। তিনি বলেন, দোকানে বেশিরভাগ সময় দোকানি থাকে না। তাই চা খেতে ইচ্ছা করলে নিজেই বানিয়ে নিই। সঙ্গে কেউ থাকলে তার জন্যও বানিয়ে দিই। খাওয়া শেষে টাকা-পয়সা দোকানে রেখে চলে যাই। এখানে কেউ কাউকে পাহারা দেয় না, কিন্তু সবাই নিজের দায়িত্বটা বুঝে নেন।

শুধু তিনি নন, দোকানে আসা প্রায় সবাই একই নিয়ম মেনে চলেন।

অপর একজন ক্রেতা আফাঙ্গীর হোসেন বলেন, যার যখন প্রয়োজন, তখন সেই দোকানি। চা বানাচ্ছে, খাবার নিচ্ছে, শেষে দাম রেখে চলে যাচ্ছে। টাকা না থাকলে পরে এসে দিয়ে যাচ্ছে। খেয়ে দাম না দেওয়ার ঘটনা সাধারণত ঘটে না। মানুষের সততার ওপরই দোকানটি চলছে।

অদ্ভুত সুন্দর ব্যবস্থাপনার কারিগর শমসের আলী প্রতিদিন সকালে তিনি দোকান খুলে চা, বিস্কুট, কেকসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সাজিয়ে রাখেন। চুলা জ্বালিয়ে চলে যান নিজের অন্য কাজে। দুপুরের দিকে একবার এসে দেখে যান দোকানের অবস্থা। এরপর রাতে আবার এসে সারাদিনের বেচাকেনার টাকা হিসাব করে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরেন।

শমসের আলী জানান, একসময় তিনি চারাতলা বাজারেই থাকতেন। প্রতিদিন নিজের চা-নাশতার পেছনে দুইশ টাকার বেশি খরচ হতো। অন্যের দোকানে বসে টাকা খরচ না করে নিজের একটি চায়ের দোকান করার চিন্তা থেকেই শুরু এই ব্যবসা। কিন্তু অন্য ব্যবসার কারণে সারাক্ষণ দোকানে বসে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। কর্মচারী রাখার সামর্থ্য বা ইচ্ছাও ছিল না। শেষপর্যন্ত মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

শমসের আলী বলেন, সকালে এসে দোকান খুলে মালপত্র সাজিয়ে রাখি। চুলা জ্বেলে দিয়ে চলে যাই। যার যখন প্রয়োজন হয়, সে নিজের মতো করে চা-পান বানিয়ে খায়।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, মানুষের ওপর এতটা ভরসা করেও ঠকতে হয়নি তাকে।

প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচশ টাকা লাভ হয় তার। একটি ছেলে আছে, তবে সে এই দোকানের দায়িত্ব নিতে চায় না। তাই আপাতত মানুষের সততার ওপরই ভরসা রেখে দোকান চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

ঝিনাইদহ সদরের সাধুহাটি এলাকা থেকে বেড়াতে আসা আব্দুল খালেক দোকানটি দেখে থমকে যান। তিনি বলেন, এমন ঘটনা খুবই বিরল। দোকানির মানুষের প্রতি বিশ্বাস আর মানুষের সততায় মুগ্ধ হয়েছি। মানুষ সৎ হলে জীবন কতো সহজ আর সুন্দর হতে পারে, এখানে এসে বুঝলাম। শুধুমাত্র বিশ্বাসের জোরেই চার বছর ধরে ধোঁয়া উঠছে চায়ের কাপে, জমছে মানুষের আড্ডা, আর নীরবে বেঁচে আছে সততার এক গল্প।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)