সমাজবীক্ষণ
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
পৃথিবীর সব নারীবিদ্বেষী কবিতায় প্রকৃতপক্ষে নারী-পুরুষ দুজনকেই খাটো করা হয়। আসুন ওইসব নারীবিদ্বেষী কবির কষে নিন্দা জানিয়ে ইতিবাচকভাবে নারী-বন্দনা শুরু করি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বে এখন নারীর গড়বয়স ৬৮.৭৬ বছর। আর পুরুষের গড় বয়স ৬৪.৫২ বছর। পরিসংখ্যান বলছে, পুরুষের নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতি বছর অগণিত নারী অকালে প্রাণ না হারালে, তাদের গড়আয়ু আরেকটু বেশি হতো। কে জানে, অফিসের সিনিয়র কলিগরা জুনিয়র নারী কলিগদেরকে ‘আপু’ ডাকার পেছনের কাহিনি এটাই কিনা! তবে আমার এ কথা সত্য না হলে অন্তত এটা সত্য যে, নারীর জন্য সামাজিক নর্মস কিছুটা হলেও শিথিল। এবার বুঝুন। ঠেলা সামলান। মনে রাখবেন ‘যা ভাঙা যায়, তা-ই আইন’!
আসলে পৃথিবীর ভূগোলের একটা মাপকাঠি থাকলেও নারীর ব্যাপারে পুরুষের ভণ্ডামির কোনো সীমা-পরিসীমা থাকে না। যে পুরুষ নারীকে সম্মান দেখাতে গিয়ে বলেন, ‘লেডিস ফার্স্ট’, সেই পুরুষই কিনা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, আল্লাহ প্রথম আদমকে (আ.) বানিয়েছেন। তারপর বিবি হাওয়াকে। তাও আদমের বাম পাঁজরের বাঁকা হাড় থেকে। তাহলে লেডিস ফার্স্ট হয় কেমনে? তবে এসব কথা তারা মুখে আনেন না!
আচ্ছা নারী যদি পাল্টা যুক্তি তুলে ধরে বলে, যে কোনো মাস্টারপিস তৈরির আগে শিল্পী একটা খসড়া স্কেচ তৈরি করেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষ ‘রাফ স্কেচ’ আর নারী ‘মাস্টারপিস’। তাহলে পাল্টা যুক্তি কী হতে পারে? আমার কাছে একটা যুক্তি আছে। তবে এটা বলা যাবে না!
বুকে হাত দিয়ে বলুন, একজন নারী স্রেফ একটি ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে যা বুঝিয়ে দিতে পারে, একজন পুরুষ কি তা এক প্রস্থ লেকচার দিয়েও বোঝাতে পারবে? নারী তার হৃদয়-মন থেকে কখন সবচেয়ে সত্য কথাটা বলে? কান্নার পর! আর সবচেয়ে সুখী হয়, যখন সে নিজের চেয়ে মোটা অন্য কোনো নারীকে দেখতে পায়!
হায়! হায়! প্রকৃতিও নারীর ব্যাপারে পক্ষপাত করে! পুরুষের আগে প্রকৃতি নারীকে সৌন্দর্য (যৌবন) দেয়। তবে ছিনিয়ে নেয় পুরুষের আগে। আর পুরুষরা ভীষণ বাজে বলে তারা নারীর কথা এক কান দিয়ে শোনে এবং আরেক কান দিয়ে বের করে দেয়। আবার তারাই কিনা অভিযোগে বলে, নারী পুরুষের সব কথা বেশ মনোযোগ দিয়ে দুই কানে সমানে শোনে এবং বের করে দেয় মুখ দিয়ে! তারপরও সমস্ত যোগ-বিয়োগের বাইরে একটাই সত্য: নারীই শ্রেষ্ঠ। তারা একই জিনিস একই সঙ্গে দুই ভাষায় বলতে পারে। একটি ভাষা বাচনিক, বাকি ভাষাটি শোনা যায় না। শুধু উপলব্ধি করতে হয়।
Abrose Bierce-এর The Davil’s Dictionary-তে নারীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘যে একজনের সঙ্গে কথা বলে, তাকায় দ্বিতীয়জনের দিকে, মনে রাখে তৃতীয়জনকে।’ যারা বিতর্ক থেকে দূরে থাকতে চান, তারাও সুযোগ পেলেই বলে ফেলেন, নারীকুলে কোনো ‘মোজার্ট’ নেই; যেমন করে নেই ‘জ্যাক দ্য রিপার’।
আসলে নারী ও পুরুষের মৌলিক ব্যবধান হচ্ছে একজন নারী চায় একজন পুরুষ তার সব চাহিদা পূরণ করে দিক। অন্যদিকে একজন পুরুষ চায় সব নারী তার চাহিদা পূরণ করে দিক। মানে গণ্ডগোল শুধু পাবার মাঝেই নয়, চাওয়ার মাঝেও রয়ে গেছে!
সিমোন দ্য বোভেয়ার তার ‘দি সেকেন্ড সেক্স’-এ দাবি করেছেন, নারী জন্মায় না, নারী ‘নারী’ হয়ে ওঠে। নারীবাদীদের অভিযোগ, বিশ্বের অধিকাংশ শিশুতোষ ছড়া খোকা বা খোকনকে নিয়ে। খুকুকে নিয়ে ছড়া নেই বললেই চলে। একইভাবে অধিকাংশ কার্টুন ছবির হিরোরা খোকা। তবে বাংলা কাব্যসাহিত্যের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে রাশি রাশি রমণীমোহন কবিতা। রবীন্দ্রনাথও স্তাবকতার আতিশয্যে রক্ত মাংসের রমণীকে স্বর্গের অপ্সরা বানিয়ে ছেড়েছেন। নজরুল তো তার প্রেয়সীকে সাজানোর জন্যে পুরো মহাবিশ্ব থেকে উপকরণ সংগ্রহ করতেন। আসলে পূর্ণাঙ্গ একজন নারীকে প্রত্যঙ্গ-বিশেষ ভাবার মানসিকতা অনেক পুরনো।
বাস্তবতা হচ্ছে মানবজাতি বলতে মূলত পুরুষকেই বোঝানো হয় এবং পুরুষ নারীকে নারীর নিজের মতো করে ব্যাখ্যা না করে পুরুষনির্ভর হিসেবে ব্যাখ্যা করতে সব সময় তৎপর থাকে। অন্যদিকে নারীদেরও প্রচেষ্টা একটি প্রতীকী আন্দোলনের বেশি কিছু হয়ে ওঠেনি। বিষয়টাকে এভাবেও বলা যায়, ‘তারা কেবল ততটুকুই পেয়েছে, যতটুকু পুরুষরা তাদের দিতে চেয়েছে। তারা কিছুই অর্জন করেনি। কেবল গ্রহণ করেছে। তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে থাকে পুরুষের ভেতরে।’
বলা হয়, ‘যে নারী পুরুষকে বিশ্বাস করে, সে বোকা; যে অবিশ্বাস করে, সে নির্বোধ; যে নির্ভর করে, সে অকর্মণ্য। এর বাইরে নারীর জন্য কোনো অপশন রাখেনি পুরুষ।’ পুরুষের কৌশলগত বিশ্লেষণেও নারী অসম্পূর্ণ। পুরুষ তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বেছে নিয়েছে নারীকে। কিন্তু নারীর প্রতিদ্বন্দ্বী সে নিজেই; তাই সে খণ্ডিতই থেকে যায়। এই কারণে দুর্জনেরা বলেন, নারী পছন্দ করে না স্ত্রৈণপুরুষ, কেবল নিজের স্বামীকে ছাড়া!
নারীবাদীরা ইচ্ছে করলেই মহাকাশেও বৈষম্য খুঁজে নিতে পারেন। কারণ সূর্যকেন্দ্রিক আমাদের এই সৌরজগতের গ্রহগুলোর মাঝে ভেনাস ছাড়া অন্য কোনো গ্রহ নারীর নামে হয়নি।