শামুকখোল, পরিযায়ী এই পাখিটি এখন আর বিদেশে ফিরে যায় না। দেশেই আবাস গেড়েছে।
মঙ্গলবার দুপুর দুইটার দিকে যশোর -চৌগাছা সড়কের পাশে ছোট কয়ারপাড়া গ্রামের টালিখোলা মাঠে দেখা মেলে শ’ দুয়েকের মতো মতো শামুকখোলের।
সদ্য রোপণ করা লকলকে সবুজ ধানক্ষেতে সাদাকালোর অদ্ভূত এক ঝাঁক পাখি। ধানক্ষেতে জমে থাকা বৃষ্টির জলে দুপুরের আহার সেরে নিচ্ছিল!
পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন এলাকার খাল, বিল এবং নদীর কাছাকাছি এলাকাগুলোতে স্থায়ীভাবে বসবাস এই পাখির।
আগের মতো প্রজনন শেষে শামুখখোল আর দেশের বাইরে যাচ্ছে না। বাংলাদেশেই তারা কলোনি তৈরি করে স্থায়ীভাবে থাকছে। ফলে, বাংলাদেশের আনাচে কানাচে সহজেই এই পাখির দেখা মিলছে।
শামুকখোল পাখি একসময় আমাদের দেশে গ্রীষ্মকালীন ভিজিটে আসতো। এজন্য এদের যাযাবর কিংবা পরিযায়ী পাখি বলা হয়। প্রজননের জন্য তারা অন্য দেশ থেকে আমাদের দেশে আসতো। প্রজনন শেষে তারা ফিরে যেতো।
আমাদের দেশে যে শামুকখোলগুলো আসতো সেগুলোর বেশির ভাগ মূলত স্থায়ীভাবে বসবাস করতো পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন এলাকা, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে। ভারতে বছর বছর প্রচণ্ড খরার কারণে ওই দেশে এদের প্রজনন এখন প্রায় বন্ধ হয়েছে।
বর্তমানে আবাসিক পরিবেশ অনুকূলে থাকায় এখন বাংলাদেশে প্রচুর শামুকখোল দেখা যাচ্ছে। হাওড়-বাঁওড় এবং নদী এলাকাগুলোতে শামুকখোল কলোনি স্থাপন করেছে।
শামুকখোল পাখির ইংলিশ নাম অংরধহ ঙঢ়বহনরষষ আর বৈজ্ঞানিক নাম অহধংঃড়সঁং ড়ংপরঃধহং । এই পাখির ঠোঁটের সাথে অন্য কোনো পাখির ঠোঁটের মিল নেই। এ পাখির ঠোঁটের নিচের অংশের সাথে উপরের অংশে বড় ফাঁক। এরা এই বিশেষ ঠোঁটে শামুক তুলে চাপ দিয়ে শামুকের ঢাকনা খুলে ফেলে এবং ভেতরের নরম অংশ খেয়ে নেয়। মূলত শামুকের ঢাকনা খোলার শৈল্পিক কৌশলের কারণেই এই পাখির নামকরণ করা হয়েছে শামুকখোল পাখি।
এই পাখি খুবই নিরীহ। এরা নিজেদের মধ্যে কখনো মারামারি করে না। শব্দ করে ডাকতে পারে না। বাহ্যিকভাবে পুরুষ-স্ত্রী বোঝা যায় না। সব পাখির ধরণ এক। গায়ের রঙ সাদা কালো। বয়স্ক পাখি হলে তার শরীরের সাদা রঙ অনেকটা কালচে বরণ ধারণ করে। এদের আবাসস্থল থাকে দু’টি। একটি স্থায়ী বাসা থাকে। যেখানে তারা কেবলমাত্র প্রজননের সময় অবস্থান করে। অপরটি হচ্ছে প্রজনন পরবর্তী অস্থায়ী অবস্থান। এরা প্রজননের সময় কেবল নির্দিষ্ট বাসায় চলে আসে। অর্থাৎ এই পাখি যেখানে বাসা বাঁধে সেই বাসাতেই প্রতিবছর প্রজনন করে থাকে। দীর্ঘ সময় বাসা পরিত্যক্ত অবস্থায় নষ্ট হলে তারা সেই বাসা সংস্কার করে।
এক থেকে দেড় সপ্তাহ সময় লাগে তাদের বাসা তৈরি করতে। বাসা তৈরি হলে সেখানে তারা ডিম দেয়। এই পাখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রজনন শেষ হলে এরা বাচ্চাসহ অন্য এলাকায় চলে যায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তারা দল বেধে নদী, খাল, বিল এলাকাগুলোতে অস্থায়ীভাবে অবস্থান নেয়। তারা খাল, বিল এলাকার নিকটবর্তী লোকালয়ের গাছের উঁচু ডালে রাত্রিযাপন করে।
শামুকখোল উড়তে শেখার পর শত শত মাইল ভ্রমণ করে। এরা ভোরে আবাস ছেড়ে খাদ্যের সন্ধানে বের হয়, ডানা ঝাপটিয়ে দল বেধে জলাভূমির দিকে উড়ে যায়।
এরা পানির ধারে, অল্প পানি অথবা পানির উপরে ভাসমান কিছুর উপর চুপ করে থাকে শিকার ধরতে। এছাড়াও অগভীর পানিতে হেঁটে হেঁটে কাদায় ঠোঁট ঢুকিয়ে খাবার খোঁজে। এদের খাদ্য তালিকার ৯০ ভাগ শামুক। এছাড়াও ছোট মাছ, বড় আকারের পোকা, কাঁকড়া, ব্যাঙ খেয়ে জীবন ধারণ করে।