ডেকোরেশন
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
ডিজিটাল সময়ের এই বিপন্ন প্রহরে শহরের বুকে বেঁচে থাকার শেষহীন লড়াইয়ে কোনো মতে টিকে থাকতে অনেকেই দু-কামরার ফ্ল্যাটবাড়িকেই ঘর করে তোলেন। ঘরলাগোয়া ব্যালকনি থাকলে তো গর্ব করার বাড়তি উপাদান জোটে। ওখানে সীমিত পরিসরে দুয়েকটি ফুল গাছ অথবা ইনডোর প্ল্যান্ট শোভা পেতে বাধা নেই। কিন্তু যাদের ফ্ল্যাটবাড়িতে বারান্দাও নেই, তাদের জন্য রয়েছে টেরারিয়াম। এটা হলো কাচঘেরা ছোট্ট একটি ঘর। চার চৌকো হোক কিংবা গোল, যে কোনো কাচের জারকেই বানিয়ে ফেলা যায় গাছেদের ঘর। এটাই টেরারিয়াম। এটা আবদ্ধ অথবা খোলা হতে পারে। বানানোও খুব সহজ। তবে বাংলাদেশের আবহাওয়া অনুযায়ী আবদ্ধ নয়, খোলা টেরারিয়ামই বেশি উপযোগী।
টেরারিয়ামে ঘরের সৌন্দর্য যেমন বাড়ে, তেমনি সবুজ প্রাণের উপস্থিতি শরীর ও মন দুই-ই ভালো করে। এটা মেইনটেইন করাও খুব সহজ। গাছ বসানোর পরে একবার পানি দিয়ে ভালো করে মাটি ভিজিয়ে নিতে হবে। এবং প্রতিদিন পানি স্প্রে করতে হবে দিনে একবার করে। কিছুদিন পরপর মাটিতে আঙুল দিয়ে দেখে নিতে হবে পানি লাগবে কিনা। মনে রাখতে হবে, মাটি শুকনো হলে তখনই আবার পানি দিতে হবে। প্রধানত ইনডোর প্ল্যান্টই টেরারিয়ামে ঠাঁই পায়। সোজা কথায়, যেসব গাছ স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে বেড়ে ওঠে, সেই গাছগুলোকেই বেছে নিতে হবে। সিল করা পাত্রে প্রবেশ করা তাপ মাটি এবং গাছপালা থেকে আর্দ্রতা বাষ্পীভূত হওয়ার কারণে একটি ছোট জলচক্র তৈরি হয়। জলীয় বাষ্প তারপর পাত্রের দেয়ালে ঘনীভূত হয়, অবশেষে গাছপালা এবং নিচের মাটিতে ফিরে আসে। স্বচ্ছ দেয়ালের মধ্য দিয়ে যাওয়া আলো সালোকসংশ্লেষণে সহায়তা করে।
টেরারিয়াম থাকলে কোলাহলপূর্ণ জীবনে ক্লান্ত হয়ে দিনের শেষে ঘরে ঢুকে আপনার মনটা আনন্দে ভরে উঠতে পারে। টেরারিয়াম হলো বোতলবন্দী ছোট বাগান। এটা স্ব-টেকসই গ্রিনহাউস হিসেবে কাজ করে। এটি ঐতিহ্যবাহী গাছপালা এবং ফুলের একটি সুন্দর এবং অনন্য বিকল্প।
১৮৪২ সালে ইংরেজ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ডক্টর ন্যাথানিয়েল বাগশো ওয়ার্ড টেরেরিয়াম আবিষ্কার করেন। তিনি একটি সিল করা কাচের বয়ামে মথ পিউপা বাড়ানোর সময় দুর্ঘটনাক্রমে টেরেরিয়ামটি আবিষ্কার করেছিলেন। ওয়ার্ড লক্ষ্য করেছেন যে, মথের জন্য তিনি যে পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, সেখানে শ্যাওলা এবং ফার্নগুলো সতেজ হচ্ছে।
টেরারিয়ামের ক্ষুদ্র বাস্তুসংস্থানগুলো ক্রমবর্ধমান নগরায়নে প্রকৃতির সাথে সংযোগের প্রতীক। টেরারিয়াম তৈরি এবং লালন-পালন করার কাজটি পরিবেশগত দায়িত্বের একটি ঘরোয়া স্টেটমেন্ট। এটা একটি পরিবারকে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে সহায়তা করে।
শিক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের অগ্রগতির সাথে সাথে স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়েও টেরারিয়াম এখন জায়গা করে নিচ্ছে। এই খুদে বাস্তুতন্ত্র উদ্ভিদজগৎ অধ্যয়নে মূল্যবান হাতিয়ার হয়ে উঠছে, যা ছাত্র এবং গবেষকদের একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উদ্ভিদের বৃদ্ধি, মিথস্ক্রিয়া এবং বাস্তুতন্ত্র পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ দেয়। পাশাপাশি এটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, উদ্ভিদ জীববিজ্ঞান এবং বাস্তুবিদ্যার অগ্রগতিতে অবদান রাখছে।
টেরারিয়াম মূলত আধুনিক নাগরিক সমাজের উপযোগী। কারণ এটির সাথে এখন যুক্ত হয়েছে যুতসই জ্যামিতিক নকশা আর নিপাট নান্দনিকতা। বিশেষ করে আধুনিক সমাজ পরিবেশগতভাবে বেশ খানিকটা সচেতন হওয়ার কারণে টেরারিয়ামের তাৎপর্য বেড়েছে। এটা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং আধুনিক নকশার সংবেদনশীলতার সুতোয় বোনা একটি সমৃদ্ধ ট্যাপেস্ট্রি। এই ক্ষুদ্র বাস্তুতন্ত্রের বিবর্তন প্রাকৃতিক বিশ্বের প্রতি আমাদের স্থায়ী মুগ্ধতার প্রতিফলন ঘটায়। কারণ এটা প্রকৃতিকে আমাদের ঘরে নিয়ে আসার স্থায়ী আবেদন সৃষ্টি করছে।
শহুরে জীবনে সবুজের সমারোহ তেমন দেখা যায় না। এখানে জঙ্গল কিংবা পাহাড়ের বিশালতায় হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ইচ্ছা হলেই মন ভরে নেওয়া যায় না প্রকৃতির বুনো গন্ধ। নাগরিক জীবনের এমন বাস্তবতায় ঘর বা অফিসের টেবিলে যদি গড়ে তোলা যায় একটি ছোট বাগান, তাহলে সময়ের সঙ্গে গাছগুলোও বেড়ে উঠবে; তৈরি হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি ইকোসিস্টেম। এ কারণে টেরারিয়ামকে বলা হয়, ‘খুব কম জায়গায় সবুজের নতুন জগৎ’।
টেরারিয়াম ইংরেজি শব্দ। লাতিন শব্দ ভিভারিয়াম থেকে টেরারিয়ামের উৎপত্তি। ভিভারিয়াম অর্থ বদ্ধপরিসরে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলা, পার্ক বা সংরক্ষণ করা। টেরা অর্থ শুষ্ক ভূমি, ভূপৃষ্ঠ বা স্থলভাগ। অর্থাৎ টেরারিয়ামের অর্থ হলো, বদ্ধ স্থলভাগে বাস্তুতন্ত্র। তবে টেরারিয়াম শব্দটির আরও একটি সুন্দর অর্থ আছে। টেরারিয়াম মানে ‘প্লেস অব লাইফ’ বা ‘জীবনের জন্য জায়গা’। অন্য অর্থে ‘টেরারিয়াম’ হলো অন্দরে ছোট বাগান, যা ঘরের ভেতরেই ডেকে আনে প্রকৃতির মুগ্ধতা।
টেরারিয়াম দেখতে অনেকটাই অ্যাকুয়ারিয়ামের মতো। অ্যাকুয়ারিয়াম জলজ আর টেরারিয়াম স্থল পরিবেশের প্রতিলিপি। ছোট আকারের গাছপালা, শৈবাল, ফার্ন, নানা বর্ণের পাথর, ছোট আকৃতির ডালপালা, আবার অনেক সময় ছোট ছোট জীবজন্তু ও পোকামাকড় দিয়ে সাজানো হয় এই টেরারিয়াম। এটি তৈরিতে সাধারণত কাচের পাত্র ব্যবহার করা হয়।